স্বার্থের ছায়ায় মানবতা
লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরন: বিশ্লেষণধর্মী
তারিখ: ৩ নভেম্বর ২০২৫
মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক—শব্দটা শুনলেই বুকের ভেতর কিছু কেঁপে ওঠে, তাই না?
একটা সময় ছিল, যেখানে বন্ধুত্ব মানে ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, হাসির ভাগাভাগি, দুঃখে পাশে থাকা।
আজকাল সেই শব্দটাই যেন ভারী হয়ে গেছে। একটা হাসি, একটা “কেমন আছো?”—সবই এখন হিসাবের পাতায় লেখা।
কেন এমন হলো?
শুধু একটাই লাইন মাথায় বাজে—
“অনুভূতির চেয়ে স্বার্থটাই বড় হয়ে গেছে।”
হয়তো এই লাইনটাই আজকের সমাজের আয়না।
চলো, একটু থেমে দেখি—আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি।
শৈশব থেকে শুরু: যেখানে ‘হিসাব’ শেখা শুরু হয়
আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি—ভালো কিছু করলে তবেই ভালোবাসা মিলবে।
“ভালো রেজাল্ট করো, তাহলে সবাই খুশি হবে”—এই শেখাটাই ছিল প্রথম চুক্তি।
অচেতনেই মনে গেঁথে যায়, ভালোবাসা মানে শর্ত।
স্কুলে বন্ধুত্ব মানে সেই বন্ধু, যে নোট দেয়।
কলেজে সম্পর্ক মানে, যার পাশে দাঁড়ালে স্ট্যাটাস বাড়ে।
চাকরিতে সহকর্মী মানে, যে প্রমোশন দিতে পারে।
এভাবেই আমরা অদৃশ্য এক চুক্তি লিখে ফেলেছি—
“তুমি আমাকে দাও, আমি তোমাকে দিই।”
অনুভূতি? সেটা বোনাস। মূল প্যাকেজ নয়।
সমাজের আয়নায় প্রতিফলন
শহুরে জীবন, প্রতিযোগিতা, আর অস্থির আধুনিকতা মিলে মানুষকে নিজকেন্দ্রিক করে তুলেছে।
আজ পরিবারও একধরনের লেনদেন।
বাবা-মা সন্তানের জন্য ত্যাগ করেন, সন্তান বলে—“সময় নেই।”
ভালোবাসা মাপা হয় উপহারের দামে, যত্ন মাপা হয় ফোনকলের দৈর্ঘ্যে।
আর প্রেম?
এখন তা হয়ে গেছে সোয়াইপের খেলা—ম্যাচ হলে কথা, না হলে পরের জন।
বিবাহিত জীবনে ভালোবাসা টিকে থাকে অর্থনৈতিক চাপের ফাঁকে বা সোশ্যাল মিডিয়ার ঈর্ষায়।
সব জায়গাতেই স্বার্থের হালকা ছায়া, আর অনুভূতি কোথাও আড়ালে।
সোশ্যাল মিডিয়া: ভালোবাসার নিলামঘর
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম—এগুলো এখন সম্পর্কের বাজার।
লাইক, কমেন্ট, রিল—এই সংখ্যাগুলোতেই নাকি আমাদের ভালোবাসা প্রমাণ হয়।
একটা ছবি পোস্ট করো, ৫০টা লাইক না এলে মন খারাপ হয়।
কারণ এখন আমরা নিজেকে মাপি অন্যের প্রতিক্রিয়ায়।
রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আপডেট মানেই সম্পর্কের ঘোষণাপত্র।
কিন্তু বাস্তবে?
একটা “তুমি ঠিক আছো তো?” প্রশ্নটাও আসে না।
আমরা ভালোবাসার গল্প বলি, কিন্তু ভালোবাসি না সত্যিই।
ব্যক্তিগত এক শিক্ষা
আমারও এমন এক অভিজ্ঞতা আছে।
এক বন্ধু ছিল, খুব কাছের। একদিন দেখলাম, সে আমার আইডিয়া চুরি করে প্রমোশন নিল।
সেই রাতে আমি কেঁদেছিলাম, কষ্টে নয়—বুঝে ফেলার যন্ত্রণায়।
বুঝেছিলাম, সম্পর্কগুলো আজকাল উদ্দেশ্যনির্ভর।
তবুও, সেই আঘাত আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—
সবাই এমন নয়।
দাদু-দাদির সম্পর্কের কথা মনে পড়ে—তারা কখনো হিসাব করতেন না।
দাদু অসুস্থ হলে দাদি রাত জেগে থাকতেন, শুধু ভালোবাসায়।
সেই ভালোবাসা আজও আলো হয়ে জ্বলে।
পরিবার: যেখানে স্বার্থের শিকড় গভীর
এক বন্ধুর কথা বলি।
তার মা অসুস্থ। ছেলে থাকে দুবাইয়ে। ফোনে বলল,
“মা, প্রজেক্ট চলছে, আসতে পারব না।”
মা চুপ। কিন্তু আমি শুনেছি তাঁর কান্না।
আমরা সবাই হয়তো এমন কোনো মুহূর্তের সাক্ষী।
বাবা-মা ভালোবাসে প্রত্যাশায়, সন্তান ভালোবাসে দায়িত্বে।
কেউ কাউকে পুরোটা দেয় না—সবসময় কিছুটা হিসাব থেকে যায়।
এ যেন এক অবচেতন বাণিজ্য—ভালোবাসার নামে রিটার্ন আশা।
মিডিয়া, শিক্ষা, অর্থনীতি: দোষ কার?
সবাই মিলে দায়ী।
মিডিয়া শেখায়, সম্পর্ক মানে ব্র্যান্ড।
শিক্ষা শেখায়, সফল হও, কিন্তু সহানুভূতি শেখায় না।
অর্থনীতি বলে, সময় মানে টাকা—তাহলে অনুভূতির সময় কোথায়?
ফলে বাড়ছে একাকীত্ব, ডিপ্রেশন, আত্মহত্যা।
আমরা সবাই বেঁচে আছি, কিন্তু অনুভব করা ভুলে গেছি।
প্রেম: সবচেয়ে মিষ্টি স্বার্থ
“তুই আমার জন্য কী করলি?”—এই একটা প্রশ্নেই সম্পর্ক ভেঙে যায়।
এক বান্ধবী একদিন বলেছিল, “ও আমাকে গিফট দেয়নি, তাই ব্রেকআপ করেছি।”
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুই ওর জন্য কী করেছিস?”
চুপ।
প্রেম এখন ব্যালেন্স শিট।
যেখানে ভালোবাসা মানে বিনিয়োগ, আর প্রতিদান মানে নিশ্চয়তা।
কিন্তু সত্যিকারের প্রেম?
সেটা সেই, যে রাতে ৩টায় ফোন করে বলে, “ঘুম আসছে না, শুধু তোর গলা শুনতে চাই।”
কোনো প্রত্যাশা নেই, শুধু অনুভব।
কর্মক্ষেত্র: মেশিনের মতো মানুষ
অফিসে তুমি রাত জেগে কাজ করলে, কিন্তু ক্রেডিট গেল অন্য কারো নামে।
তুমি চুপ করলে না। পরেরবার তুমি-ও একই করো।
এভাবেই শুরু হয় প্রতিযোগিতার শীতল যুদ্ধ।
মানুষ হারায়, থাকে শুধু পদবী আর পে-স্লিপ।
বসের সামনে শ্রদ্ধা নয়, দরকারই কথা বলে।
“স্যার, কফি এনেছি”—এর পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রমোশনের আশা।
সমাজ: স্বার্থের জাল
ভোট দিই টাকার আশায়।
বিয়ে ঠিক করি গাড়ির সংখ্যায়।
দানও করি ছবি তুলে—পোস্ট দেবো বলে।
একজন বৃদ্ধ রাস্তায় পড়ে ছিলেন, দশজন পাশ কাটিয়ে গেল।
একজন থামল, সাহায্য করল না—ভিডিও করল।
“কনটেন্ট হবে।”
এটাই আমরা হয়ে গেছি।
তবু আশা আছে
সব শেষ হয়নি।
আমরা চাইলে ফিরতে পারি—ছোট ছোট কাজের মধ্যে দিয়ে।
একটা সত্যিকারের হাসি, কোনো স্বার্থ ছাড়া।
একটা “তুই কেমন আছিস?”—শুধু জানতে চাওয়া, কিছু চাওয়া নয়।
মায়ের হাতে চা দিয়ে বলা, “তোমাকে ছাড়া আমি অচল।”
প্রেমিকাকে বলা, “তোর কিছু দিতে হবে না, শুধু থাক।”
আমার দাদি বলতেন,
“ভালোবাসা দিতে গেলে হাত খালি করতে হয়।”
আমরা এখন হাত ভর্তি রাখি—স্বার্থ, অহংকার, ভয়।
কিন্তু যদি একটু খালি করি?
শেষ কথা
স্বার্থ বড় হলে মানুষ ছোট হয়ে যায়।
অনুভূতির আলো নিভে গেলে জীবন খালি খোলস হয়ে পড়ে।
তাই বলি—হৃদয়ে যদি ঝড় ওঠে, তাকে থামিও না।
ওটাই বদলে দিতে পারে একটা সম্পর্ক,
একটা মানুষ,
একটা জীবন।
আর শুরু করো আজ থেকেই।
#মানবসম্পর্ক #স্বার্থVsঅনুভূতি #হারানোবন্ধন #হৃদয়েরঝড় #সমাজেরআয়না #অনুভূতিরআলো #মানবতারফেরা #সম্পর্কেরপুনর্জন্ম #enolej_idea
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।