হতাশা: দুর্বলতা নয়, মানসিক অসুস্থতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৮ মে, ২০২৬
আমরা শরীর খারাপ হলে চিকিৎসকের কাছে যাই। জ্বর, ডায়াবেটিস, জন্ডিস কিংবা ক্যান্সারকে অসুখ হিসেবে মেনে নিতে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। অথচ মনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ভয়, শূন্যতা, ক্লান্তি কিংবা হতাশাকে আমরা অনেক সময় “অতিরিক্ত চিন্তা” বলে এড়িয়ে যাই।
এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল।
হতাশা কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়। এটি একটি মানসিক অসুস্থতা, যা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। আর মানসিক অসুস্থতা মানেই “পাগলামি” বা অস্বাভাবিক আচরণ—এই ধারণাটিও ভুল।
ভয় আর হতাশার মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। মানুষ হঠাৎ করেই ভয় পায় না। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়, পারিবারিক চাপ, ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা নিজের স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার আতঙ্ক—এসব ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য ক্লান্তি তৈরি করে।
সব মানুষ সেই ক্লান্তি প্রকাশ করতে পারে না।
কেউ আগের মতো কথা বলে না। কেউ অল্পতেই বিরক্ত হয়ে যায়। কারও ঘুম কমে যায়, কারও আবার বিছানা ছাড়তেই ইচ্ছা করে না। কেউ নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেয়, কেউ আবার জোর করে হাসে যেন কেউ বুঝতে না পারে ভেতরে কতটা ঝড় চলছে।
হতাশার চেহারা একেকজনের কাছে একেক রকম। কারও সারাদিন ক্লান্ত লাগে, কারও মনোযোগ হারিয়ে যায় অকারণে। কেউ নিজের ওপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। আগে যেসব জিনিসে আনন্দ পেত, সেগুলোও ধীরে ধীরে অর্থহীন লাগতে থাকে। অনেকেই প্রতিদিন নিজের ভেতরে ভাঙা-গড়ার এক নীরব যুদ্ধ লড়তে থাকে, অথচ আশেপাশের মানুষ তার কিছুই বুঝতে পারে না।
সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হলো—অনেক মানুষ বুঝতেই পারে না, সাহায্য চাওয়াটাও সমাধানের অংশ হতে পারে। কারণ আমাদের সমাজ এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে শেখেনি। আমরা শারীরিক ব্যথাকে গুরুত্ব দিই, কিন্তু মানসিক যন্ত্রণাকে প্রায়ই “মন শক্ত করো”, “এত ভাবলে চলে?” কিংবা “সব ঠিক হয়ে যাবে” ধরনের কথায় ছোট করে ফেলি।
সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করাটাও ক্লান্তিকর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বলেছেন, শারীরিক সুস্থতার মতো মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মন এবং শরীর একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ভয়, দুঃখ, হতাশা—এসব অনুভূতি জীবনে আসবেই। কিন্তু যখন এই অনুভূতিগুলো মাসের পর মাস মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে থাকে, তখন সেটাকে আর শুধু “মন খারাপ” বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
হতাশাকে লুকিয়ে রাখা নয়, বোঝা দরকার। প্রয়োজন হলে পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কারণ সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়; বরং সুস্থ হওয়ার প্রথম ধাপ।
মানুষ আসলে বাঁচতে চায়। শান্তিতে, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চায়। আর সেই পথটাকে সহজ করার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং খোলামেলা আলোচনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আমার পরের লেখায় থাকবে হতাশা থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসার কিছু বাস্তবধর্মী উপায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।