ডিজিটাল ঔপনিবেশিকতার লুকানো মূল্য
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫
সকাল শুরু হয় একটা প্রশ্ন দিয়ে, সন্ধ্যা শেষ হয় আরেকটা কমান্ডে। মাঝখানে আমাদের চিন্তা, ছবি, লেখা, কাজ—সবকিছুই ঘুরপাক খায় কয়েকটা অ্যাপ আর প্ল্যাটফর্মের ভেতরে। মোবাইল ফোনটাই যেন নতুন যুগের কারখানা। ব্যবহার সহজ, ফল দ্রুত, সুবিধা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সুবিধার আসল খরচটা কে দিচ্ছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু বৈশ্বিক গবেষণা চোখ খুলে দেয়। হিসাব বলছে, কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালু রাখতে ২০২৫ সালেই যে পরিমাণ কার্বন বাতাসে ছড়াতে পারে, তা অনেক বড় শহরের বার্ষিক নিঃসরণের সমান। শুধু বাতাস না—পানি, বিদ্যুৎ, ভূমি—সবকিছুর ওপর চাপ ভয়াবহ। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে যে পরিমাণ পানি উবে যাচ্ছে, তা দিয়ে বহু দেশের মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো যেত। আমার নিজের এলাকায় গত এক বছর ধরে বিদ্যুৎ বিলটা হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেছে—ভাবি, এর সঙ্গে কি এই ডেটা সেন্টারগুলোর কোনো যোগাযোগ আছে? তাহলে এটাকে আমরা উন্নয়ন বলব, না নিঃশব্দ লুণ্ঠন?
এই জায়গাতেই ইতিহাস ফিরে আসে। একসময় সাম্রাজ্য গড়ে উঠত সোনা, মসলা আর জমির দখল নিয়ে। আজ দখলের বস্তু বদলেছে—এখন দখল করা হয় তথ্য, বিদ্যুৎ আর ভবিষ্যৎ। তখন যেমন লাভ যেত উপনিবেশকারী শক্তির ঘরে, আজও তেমনই কয়েকটি প্রযুক্তি জায়ান্ট গোটা বিশ্বের সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের মুনাফা বাড়াচ্ছে। ক্ষতিটা বহন করছে সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ।
ডেটা সেন্টারগুলো আজকের দিনের উপনিবেশিক ঘাঁটি। এগুলো ছোট কোনো অবকাঠামো না—একেকটা বিদ্যুৎ খরচ করে একটা মাঝারি দেশের মতো। নদীর পানি টেনে নেয়, বাতাস গরম করে তোলে, স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলাফল হিসেবে বাড়ে বিদ্যুৎ বিল, কমে পানির প্রাপ্যতা, পরিবেশ আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে। অথচ এই ক্ষতির দায় কেউ নেয় না—কারণ লাভটা সীমাবদ্ধ থাকে কর্পোরেট বোর্ডরুমে।
পরিবেশের বাইরেও আরেকটা বড় ক্ষতি চলছে—মানুষের জীবিকা। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম আর এআই টুল সবচেয়ে আগে আঘাত করছে নতুন ও মাঝারি স্তরের চাকরিতে। আমার এক বন্ধু গ্রাফিক ডিজাইনার—সে এখন AI-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছে। যেসব কাজ দিয়ে তরুণরা কর্মজীবনে ঢুকত, সেগুলোই সবচেয়ে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য জমা হচ্ছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে, যারা জানে আমরা কী ভাবি, কী কিনি, কখন ভয় পাই। এই তথ্য দিয়েই তারা নিজেদের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করছে।
আর গ্লোবাল সাউথ? সেখানে সস্তা শ্রমে ডেটা পরিষ্কার করানো হচ্ছে, কনটেন্ট লেবেল করানো হচ্ছে, মানসিকভাবে ক্ষতিকর কাজ করানো হচ্ছে—ঠিক সেই পুরোনো উপনিবেশিক কাঠামোর মতো। পার্থক্য শুধু এতটুকু: এবার শিকলটা চোখে দেখা যায় না।
তাই প্রশ্নটা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে না, প্রশ্নটা ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে। কেন কয়েকটি কোম্পানি ঠিক করবে—কত পানি খরচ হবে, কত কার্বন ছাড়বে, কে চাকরি পাবে, আর কে বাদ পড়বে? এটা উদ্ভাবনের গল্প না—এটা নতুন ধরনের সামন্ততন্ত্র, যেখানে ডিজিটাল রাজারা নিয়ম বানায়, আর বাকিরা শুধু মানিয়ে নেয়।
এখনও সময় আছে। স্বচ্ছতা দাবি করা যায়। আইন দিয়ে বাধ্য করা যায়—কে কত সম্পদ ব্যবহার করছে, তার সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য কত। বিকল্প প্রযুক্তি, স্থানীয় ডেটা অবকাঠামো, ন্যায্য শ্রমনীতি—সবই সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে এবং নাগরিক চাপ তৈরি হয়।
চুপ করে থাকলে ইতিহাস আবারও আমাদের বিরুদ্ধে রায় দেবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো প্রশ্ন করবে—সব জানার পরও আমরা কেন কিছু করিনি?
ডিজিটাল উপনিবেশ অনিবার্য নয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে আগে বুঝতে হবে—এই তথাকথিত সুবিধার পেছনে আসলে কী হারাচ্ছি।
#ডিজিটালঔপনিবেশিকতা #AIওপরিবেশ
#প্রযুক্তিররাজনীতি #ডেটাউপনিবেশ
#জলবায়ুসংকট #TechInequality #DigitalColonialism #AIEthics
#GlobalSouth #চিন্তারখোরাক
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।