ফেসবুক কি বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি করছে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
“আজকাল অনেক লেখক বইয়ের চেয়ে ফেসবুকের লাইককে বেশি গুরুত্ব দেন—এটা কি সাহিত্যের জন্য বিপদের লক্ষণ?”
প্রশ্নটা কঠিন।
কারণ ফেসবুক এখন শুধু বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গা নয়। অনেক লেখকের কাছে এটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। যে লেখক হয়তো কোনো পত্রিকার পাতায় জায়গা পেতেন না, তিনিও এখন নিজের লেখা সরাসরি হাজার মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন।
তাহলে ফেসবুক বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি করছে—এ কথা সরাসরি বলা যায়?
আমার মনে হয়, সমস্যাটা ফেসবুক নয়।
সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন একজন লেখক লাইককে সাহিত্যিক স্বীকৃতি ভাবতে শুরু করেন।
একটি লেখা পোস্ট করা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার আসতে শুরু করল। লেখক বুঝলেন—এই ধরনের লেখা মানুষ বেশি পছন্দ করছে।
পরের লেখাটা তাই একটু সেদিকেই গেল।
তারপর আরও একটু।
একসময় হয়তো নিজের অজান্তেই লেখক পাঠকের পছন্দ অনুযায়ী লিখতে শুরু করলেন।
এখানেই বিপদ।
কারণ পাঠক কী পছন্দ করছেন আর একজন লেখকের কী লেখা উচিত—এই দুটো সবসময় এক নয়।
মানুষ মিষ্টি পছন্দ করে বলে একজন রাঁধুনি প্রতিদিন শুধু মিষ্টিই রান্না করবেন না। একজন লেখকের কাজও শুধু পাঠককে যা ভালো লাগে, তা দিয়ে যাওয়া নয়।
কখনো তাঁকে এমন কিছু লিখতে হবে, যা পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলবে। এমন প্রশ্ন তুলতে হবে, যার উত্তর কেউ শুনতে চাইবে না। এমন সত্য লিখতে হবে, যার জন্য দশ হাজার লাইক নয়, হয়তো দশজন পাঠকও পাওয়া যাবে না।
তবু সেটি লেখা দরকার।
কারণ ভাইরাল হওয়ার জন্য লেখা আর দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য লেখা এক জিনিস নয়।
ভাইরাল লেখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাহিত্য সবসময় দ্রুত ছড়ায় না।
কখনো একটি লেখা আজ খুব বেশি মানুষ পড়ে না, কিন্তু কয়েক বছর পরে কেউ সেটি খুঁজে পড়ে। কোনো বই প্রকাশের সময় তেমন আলোচনাই পায় না, অথচ সময় তার মূল্য আবিষ্কার করে।
সাহিত্যের এই দীর্ঘ যাত্রাকে কয়েক ঘণ্টার লাইক-কমেন্ট দিয়ে মাপা যায় না।
ফেসবুকের সবচেয়ে বড় প্রলোভন এখানেই—তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।
লেখা পোস্ট করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে গেলেন মানুষ কী বলছে।
কিন্তু একজন লেখকের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া সবসময় এত দ্রুত আসে না।
কখনো একজন পাঠক চুপচাপ লেখাটা পড়েন। কোনো মন্তব্য করেন না। শেয়ার করেন না। কয়েক দিন পর এসে বলেন—
“আপনার ওই লেখাটার একটা কথা এখনো মাথা থেকে যাচ্ছে না।”
অ্যালগরিদম হয়তো এই পাঠককে ঠিকমতো গুনতে পারে না।
কিন্তু সাহিত্য পারে।
কারণ সাহিত্যিক প্রভাব আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এক জিনিস নয়।
আরেকটি বিপদ আছে—অতিরিক্ত প্রশংসা।
“অসাধারণ!”
“মাস্টারপিস!”
“আপনার সেরা লেখা!”
এই কথাগুলো লেখকের ভালো লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবার শুধু প্রশংসা পেতে পেতে একজন লেখক যদি নিজের লেখাকে প্রশ্ন করাই বন্ধ করে দেন, তখন সমস্যা।
একজন লেখকের মাঝে মাঝে নিজের লেখাকে নিয়ে সন্দেহ করা দরকার।
এই বাক্যটা কি সত্যিই দরকার ছিল?
এই অংশটা কি ছোট করা যেত?
আমি কি একই কথা আগেও লিখেছি?
চরিত্রটা কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
কিন্তু সেই অস্বস্তিই লেখাকে পরিণত করে।
তবে ফেসবুকের ভালো দিকও অস্বীকার করার উপায় নেই।
এটি প্রচলিত প্রকাশনা ব্যবস্থার কিছু দরজা খুলে দিয়েছে। নতুন লেখক সরাসরি পাঠকের কাছে যেতে পারছেন। পরিচিতি ছাড়াই পাঠক তৈরি করতে পারছেন। একটি ছোট গল্প থেকে একটি পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে, আর সেই পাঠকরাই পরে লেখকের বই কিনতে পারেন।
এই সুযোগকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।
তাই ফেসবুককে সাহিত্যের শত্রু বলা ভুল।
ফেসবুক একটি মাধ্যম।
সমস্যা তখনই, যখন মাধ্যমটাই লক্ষ্য হয়ে যায়।
একজন লেখক ফেসবুকে লিখবেন, পাঠকের সঙ্গে কথা বলবেন, লাইক-কমেন্ট পাবেন, নিজের বইয়ের প্রচার করবেন—সবই করবেন।
কিন্তু দিনের শেষে তাঁকে ফিরে যেতে হবে নিজের লেখার টেবিলে।
সেখানে কোনো লাইক নেই।
কোনো শেয়ার নেই।
কেউ “অসাধারণ” বলছে না।
শুধু তিনি আর তাঁর লেখা।
একটা টেবিল। একটা খালি চেয়ার। আর কেটে ফেলার জন্য অপেক্ষা করা একটা বাক্য।
সেখানেই আসল পরীক্ষা।
তিনি কি তখনও নিজের দুর্বল বাক্য কেটে ফেলবেন?
নিজের প্রিয় অংশটাও কি বাদ দিতে পারবেন, যদি বুঝতে পারেন সেটি লেখার প্রয়োজন নেই?
এমন কিছু কি লিখবেন, যা হয়তো ভাইরাল হবে না, কিন্তু তাঁর নিজের কাছে সত্য?
সাহিত্যের ভবিষ্যৎ হয়তো এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
ফেসবুক শত্রু নয়।
লাইককেও ঘৃণা করার দরকার নেই।
শুধু মনে রাখা দরকার—
লাইক একটি সংখ্যা।
পাঠক একটি সম্পর্ক।
আর সময়—সবচেয়ে কঠিন সমালোচক।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।