সমাজ বদলে নারী সমতার গুরুত্ব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | জানুয়ারি ৩০, ২০২৬
আমরা অনেক সময় ভাবি, নারী সমতা মানে ব্যানার, স্লোগান আর কিছু উত্তেজিত শব্দ।
কিন্তু বাস্তবে নারী সমতা কোনো শব্দ নয়, এটি একটি সমাজের শ্বাস-প্রশ্বাস।
যে সমাজ তার অর্ধেক মানুষকে আটকে রাখে, সে সমাজ যতই উন্নয়নের কথা বলুক না কেন, ভেতরে ভেতরে সে থমকে যায়।
চারপাশে তাকালেই বোঝা যায়, এই থেমে যাওয়ার চিহ্ন কতটা গভীরে।
একই ঘরে বড় হওয়া দুই সন্তান—একজন ছেলে, একজন মেয়ে।
ছেলেটা ভুল করলে তাকে শেখানো হয়, মেয়েটা ভুল করলে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়।
এই পার্থক্যটা কোনো আইনের পাতায় লেখা নেই, কিন্তু প্রতিদিনের আচরণে স্পষ্ট।
আমরা মুখে বলি নারী-পুরুষ সমান।
কিন্তু কাজের সময়, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে, সেই সমতা কোথাও গিয়ে হালকা হয়ে যায়।
এটা শুধু সুযোগের প্রশ্ন নয়, এটা মানসিকতার প্রশ্ন।
অনেকেই এখনো মনে করেন, নারীর জায়গা ঘরেই।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
আজকের নারী শুধু সংসার সামলায় না, সে অর্থনীতি সামলায়, ভবিষ্যৎ গড়ে।
আমার গ্রামের এক মেয়ের কথা মনে পড়ে। স্কুল ছেড়ে সেলাই শিখেছিল।
ছোট একটা ঘর থেকে কাজ শুরু করে আজ পাঁচজন নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
তার সন্তানেরা স্কুলে যায়। তার সংসার দাঁড়িয়ে গেছে নিজের পায়ে।
একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়ায়, তখন সে একা দাঁড়ায় না।
তার সঙ্গে দাঁড়ায় একটি পরিবার, কখনো কখনো একটি প্রজন্ম।
নারী সমতা শুধু নারীদের উপকার করে—এই ধারণাটাও অসম্পূর্ণ।
পুরুষরাও এই অসমতার ভার বহন করে।
সমাজ তাদের কাঁধে সব দায় চাপিয়ে দেয়—উপার্জন, সিদ্ধান্ত, শক্ত থাকা।
কিন্তু শক্ত থাকার এই বাধ্যবাধকতাও একধরনের বন্দিত্ব।
যেখানে দায় ভাগ হয়, সম্মান ভাগ হয়, সেখানে মানুষ হওয়া সহজ হয়।
একটি সমাজ কেমন হবে, তা অনেকটা নির্ভর করে তার শিশুদের চোখে কী ধরা পড়ছে তার ওপর।
একটি ছেলে যদি দেখে তার মা বা বোনকে অবহেলা করা হচ্ছে, সে সেটাকেই স্বাভাবিক ভাবতে শেখে।
আর যদি দেখে সম্মান আর সুযোগ সমান, সে বড় হয় ভিন্ন মানুষ হয়ে।
অনেকে ভয় পান—নারীরা স্বাধীন হলে নাকি সমাজ ভেঙে যাবে।
এই ভয় আসলে স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা।
স্বাধীনতা মানে দায়হীনতা নয়।
স্বাধীনতা মানে নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
কর্মক্ষেত্রে আজও নারীরা পিছিয়ে পড়েন—একই কাজ, কম বেতন; একই যোগ্যতা, কম স্বীকৃতি।
এর সঙ্গে যোগ হয় নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ, পুরনো সংস্কার।
আইন আছে, কিন্তু মন বদলায়নি বলেই সমস্যাগুলো টিকে আছে।
এই পরিবর্তন কোনো একদিনে হবে না।
কিন্তু শুরুটা আমাদের প্রত্যেকের ঘর থেকেই হতে পারে।
কথাবার্তায়, সিদ্ধান্তে, সন্তানের সামনে আচরণে।
সম্প্রতি সরকার ILO-এর সহায়তায় Gender and Skills Taskforce Action Plan 2025–2027 অনুমোদন করেছে।
এটি নারীদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলতে পারে।
কিন্তু পরিকল্পনা কাগজে থাকলেই সমাজ বদলায় না।
সমাজ বদলায় তখনই, যখন মানসিকতা বদলায়।
নারী সমতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়।
এটি একটি সুস্থ সমাজের ন্যূনতম শর্ত।
যে সমাজ এই সত্য মেনে নিতে শেখে, সে সমাজই সামনে এগোয়।
আজ নারী সমতা আর কোনো বিকল্প পথ নয়।
এটাই অগ্রগতির একমাত্র রাস্তা।
#নারীসমতা #সমাজপরিবর্তন #লিঙ্গবৈষম্য #নারীরঅধিকার #বাংলাগদ্য
#মানসিকতারপরিবর্তন #সমতারসমাজ #WomenEmpowermentBD
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।