অন্যায়ের যুক্তি মানেই বিবেকের মৃত্যু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। জানুয়ারি ১৭,২০২৬
যখন মানুষ নিজের ভেতরের নৈতিক কম্পাসকে ভোগার সুযোগ দেয়, তখন অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অন্যায়ের যুক্তি মানেই বিবেকের মৃত্যু—এই লেখা সেই ভয়ানক মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতার আলো ফেলে।
বিবেকের পঁচন: সমস্যা এবং বাস্তবতাঃ
বিবেক মানুষের ভেতরের সেই নীরব আদালত, যেখানে ভালো আর মন্দের ফয়সালা হয়। কিন্তু যখন বিবেকের শরীরে পঁচন ধরে, তখন আদালত কাজ করতে থাকে না। মানুষ তখন অন্যায়কে আর অন্যায় বলে না, বরং তার পক্ষে যুক্তি খুঁজতে থাকে।
পঁচন একদিনে শুরু হয় না। স্বার্থ, ভয়, এবং “সবাই তো করছে” এই ভীতি ধীরে ধীরে আমাদের বিবেককে নষ্ট করে।
অন্যায়কে যৌক্তিক করার মনস্তত্ত্বঃ
মানুষ সাধারণত নিজেকে খারাপ ভাবতে চায় না। তাই অন্যায় বা অনৈতিক কাজের সময় তার ভেতর এক সহজ পথ খুঁজে নেয়—নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার যুক্তি।
কেউ বলে, “পরিস্থিতি এমন ছিল।”
কেউ বলে, “আমার কিছু করার ছিল না।”
কেউ বলে, “এর চেয়েও খারাপ তো অনেকে করছে।”
এই যুক্তিগুলো আসলে আত্মরক্ষার কৌশল। অপরাধবোধ এড়াতে মানুষ অন্যায়কে যুক্তির পোশাক পরায়। এভাবেই বিবেক আরও পচতে থাকে।
সমাজ কীভাবে বিবেককে নিস্তেজ করেঃ
যদি অন্যায় বারবার শাস্তিহীন থাকে, তাহলে সেটাই নিয়মে পরিণত হয়। ভালো মানুষও প্রশ্ন করতে ভয় পায়। নীরবতা সামাজিক ভদ্রতার নাম পায়, আর প্রতিবাদকে বলা হয় বাড়াবাড়ি।
ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাব একসঙ্গে হলে বিবেক সবচেয়ে দ্রুত পচে। তখন অন্যায় শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, প্রাতিষ্ঠানিকও হয়ে যায়। মানুষ তখন সত্য নয়, সুবিধার পক্ষে দাঁড়ায়।
ধর্ম, রাজনীতি ও নৈতিকতার অপব্যবহারঃ
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—যখন অন্যায়ের পক্ষে ধর্ম, রাজনীতি বা আদর্শের ভাষা ব্যবহার করা হয়। তখন মানুষ প্রশ্ন করে না, বিশ্বাস করে। আর বিশ্বাসের মোড়কে মোড়া অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়।
নৈতিকতার কথা বলা হয়, কিন্তু প্রয়োগ হয় নির্বাচিত ক্ষেত্রে। এভাবেই বিবেক শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের শরীরে পঁচে যায়।
নীরবতা: অন্যায়ের সহায়ঃ
অনেকে মনে করে অন্যায় না করলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু সত্য হলো—অন্যায়ের সময় চুপ থাকা নিজেই এক ধরনের অংশগ্রহণ। নীরবতা অন্যায়কে শক্তি দেয়, বৈধতা দেয়।
যে সমাজে প্রশ্ন করা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, সেই সমাজে পঁচন থামানো প্রায় অসম্ভব। কারণ তখন বিবেক জাগ্রত নয়, বরং প্রশিক্ষিতভাবে ঘুমিয়ে থাকে।
প্রতিরোধ শুরু কোথা থেকে?
বিবেকের পঁচন থামাতে বড় বিপ্লবের দরকার নেই। শুরু করতে হবে নিজের ভেতর থেকে। নিজের স্বার্থের বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভুলের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার শক্তি—এই দুটোই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
একবার মানুষ অন্যায়কে যৌক্তিক মনে করতে শিখে গেলে, সেই সমাজে আর কোনো অন্যায়ই অস্বাভাবিক থাকে না। ইতিহাস আর বিবেক—দুটোই নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
#অন্যায়ের_যুক্তি #বিবেকের_পঁচন #নৈতিক_অবক্ষয় #সমাজ_ও_বিবেক
#নীরবতার_অপরাধ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।