মধ্যবিত্তের শখ বনাম বাজেট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন |
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ০১,২০২৬
অফিস ফেরত পথে শোরুমের কাঁচের ওপর দিয়ে চোখ চলে গেল একটি জ্যাকেটের দিকে। কালারটা এমন গাঢ় নীল যে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া দায়। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, জ্যাকেটটা যদি গায়ে জড়াই, বোধহয় সারাটা শীতই আরামে কেটে যাবে। কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতার একটা নিজস্ব ব্রেকিং সিস্টেম আছে। শখের রেশটা যখন পায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন মস্তিষ্কের প্রথম প্রশ্নটা ডিজাইন নয়, দাম।
শোরুমে ঢুকে জ্যাকেটটা হাতে নিলাম। সুতি নয়, বোধহয় মিশ্র ফাইবার—তবু কাটিংটা ভালো। চোখটা স্বাভাবিকভাবেই প্রাইস ট্যাগের দিকে চলে গেল। দামটা দেখেই হাত যেন নিজের অজান্তেই সরে এল। মাথার ভেতর একটা অদৃশ্য ক্যালকুলেটর চালু হয়ে গেল—এই টাকাটা দিলে মাসের বাজারের হিসাব মিলবে তো? মায়ের ওষুধের জন্য যে টাকাটা আলাদা করে রাখা, সেটার কী হবে? নিজের জন্য খরচ করার চিন্তাটা এক সেকেন্ডেই দায়িত্বের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
পাশ থেকে সেলসম্যান এগিয়ে এল।
— “ভাইয়া, সাইজটা ফিট করে দেখবেন? কালারটা আপনাকে মানাবে।”
আমি হালকা একটা হাসি হাসলাম।
— “না দাদা, কালারটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। পরে আসব।”
কথাটা বলেই একটু অস্বস্তি হলো। সত্যি বলতে, কালারের কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল আমার পকেটে। এই ছোট মিথ্যেটাই যেন আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী—নিজের শখকে না বলার সময় সত্যটা বলা যায় না।
বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, শখ আর বাজেটের এই লড়াইটা আমি কতবার হেরেছি? আমরা মধ্যবিত্তরা স্বপ্ন দেখি, কিন্তু ঘুম ভাঙার পর হিসাবের খাতায় সেই স্বপ্নগুলো ভাঁজ করে তুলে রাখি। ছেলের স্কুলের ফি, স্ত্রীর প্রয়োজন, বাবা-মায়ের চিকিৎসা—এই তালিকাটা কখনো ছোট হয় না। নিজের জন্য কিছু চাইলে মনে হয়, বুঝি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
এই ভাবনাগুলো ধীরে ধীরে এক ধরনের চাপ তৈরি করে। আমরা ভাবতে শুরু করি, শখ মানেই অপব্যয়। অথচ কখনো কখনো মনে হয়, জীবনটা যদি শুধু হিসাব-নিকাশেই কেটে যায়, তাহলে বাঁচার আনন্দটা কোথায় থাকে? ওই জ্যাকেটটা কিনলে হয়তো খুব বড় কিছু বদলে যেত না, কিন্তু নিজের ভেতরে কোথাও একটা ছোট অনুভূতি জন্মাত—যে, আজ অন্তত নিজের জন্য কিছু করলাম।
সমাধান হয়তো একদম সহজ না। কিন্তু শখ আর বাজেটের মধ্যে একটা নীরব সমঝোতা দরকার। সারা বছর না হোক, বছরে একদিন। খুব বেশি না হোক, সামান্য। নিজের ইচ্ছেগুলোকে সবসময় গলার কাছে চেপে রাখলে ভেতরের মানুষটা একসময় কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আর তখন দায়িত্ব পালন করলেও, তার ভেতরে আর আনন্দ থাকে না।
শোরুমটা অনেক দূরে চলে এসেছে। জ্যাকেটটা আর চোখে পড়ছে না। কিন্তু মাথার ভেতরে ছবিটা রয়ে গেছে—নীল রঙের, কাঁচের ভেতরে ঝুলে থাকা। হয়তো আবার কোনো একদিন, কোনো অন্য শীতের সন্ধ্যায়, এমনই কোনো কাঁচের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ব। তখন কী করব, ঠিক জানি না। শুধু জানি, এই দ্বিধাটাই হয়তো আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে চেনা অনুভূতি।
#মধ্যবিত্ত_জীবন #শখ_বাজেট #বাংলা_ব্লগ #মানসিক_চাপ #ব্যক্তিগত_গল্প #বিশ্লেষণধর্মী #LifeBalance
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।