নিশির দিনগুলো
গল্প-৮ : একাকী রাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
দিনের ভিড়ে সে শক্ত থাকে, কিন্তু রাত নামলেই ভেঙে পড়ে।
অভিক চলে যাওয়ার পর নিশির সবচেয়ে ভয় লাগত রাতকে।
দিনে তেমন বোঝা যেত না। সকালে অফিস, ফেরার পথে বাজার, বাসায় এসে রান্না, মেঘ আর মিশির পড়াশোনার খোঁজ, কাজের ভিড়ে সময়টা কেটে যেত।
কিন্তু রাত হলেই ঘরটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যেত।
সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর নিশি বারান্দায় গিয়ে বসত। চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠত। পাশের ফ্ল্যাটের আলোগুলো একে একে নিভে যেত।
তারপর শুরু হতো স্মৃতিগুলো।
এই বারান্দাতেই অভিক বসে চা খেত। ঈদের আগে কী কিনবে, মেঘের পড়াশোনা, মিশির ভবিষ্যৎ, কত কথা হতো।
এখন সেই চেয়ারটা খালি পড়ে থাকে। নিশি অনেকদিন সেটা সরাতেও পারেনি।
এক রাতে ঘুম ভেঙে মিশি পানি খেতে বেরিয়ে দেখল, মা বারান্দায় বসে আছে।
"মা, তুমি এখনও জেগে?"
নিশি চমকে তাকাল।
"ঘুমটা ভেঙে গেছে।"
মিশি পাশে এসে বসল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর মিশি আস্তে করে বলল,
"তুমি কি এখনও বাবার কথা ভাবো?"
নিশি একটু হেসে ফেলল,
"একটা মানুষকে কি এত সহজে ভুলে থাকা যায়?"
মিশি মায়ের হাতটা ধরে বলল,
"আমরা তো আছি।"
এই ছোট্ট কথাটাই সেদিন নিশির চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিল।
সে বুঝতে পারল, নিজের কষ্টটা এতদিন লুকাতে গিয়ে সে হয়তো মেয়েদেরও দূরে সরিয়ে রাখছিল। কষ্ট লুকিয়ে রাখলে কষ্ট কমে না, বরং দূরত্ব বাড়ে।
তারপর থেকে সে একটা নিয়ম করল।
রাতে সবাই একসঙ্গে চা খাবে। কখনো গল্প হবে, কখনো পুরোনো অ্যালবাম দেখা হবে, কখনো শুধু ছাদে গিয়ে হাঁটা হবে। নিজের ভেতরের কথাগুলো আর একা একা বয়ে বেড়াবে না।
সব রাত যে ভালো কাটত, তা নয়। কিছু কিছু রাতে এখনও অভিকের কথা মনে পড়ে বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে যায়।
তবে এখন আর সেই কষ্টটা সে একা বয়ে বেড়ায় না।
একদিন মেঘ বলল,
"মা, বাবা থাকলে চাইত তুমি এভাবেই বাঁচো। হাসিখুশি থাকো।"
নিশি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কথাটা সত্যি কি না, সে জানে না। তবে একটা জিনিস সে বুঝে গেছে।
শোক মানে কাউকে ভুলে যাওয়া নয়।
শোক মানে তার অনুপস্থিতিটা মেনে নিয়েও ধীরে ধীরে আবার বাঁচতে শেখা।
অভিকের জায়গাটা আজও খালি। সেটা কোনোদিন পূরণ হবে না।
কিন্তু সেই শূন্যতা নিয়েই নিশি, মেঘ আর মিশি আবার হাসতে শিখেছে।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা।
ভেঙে পড়া নয়। ভাঙা মন নিয়েই সামনে হাঁটতে পারা।
চলবে.........গল্প-৯ : সমাজের বিচার (সেদিন নিশি আর কষ্ট পেল না। শুধু অবাক হলো। একজন মানুষ কী পরবে, কোথায় যাবে, কখন হাসবে, এসব নিয়েও এত বিচার হতে পারে!)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।