মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় অভাবী মানুষকেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ মার্চ ২০২৬
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার বনানীর মোড়ে হাঁটছিলাম। অফিস ছুটির সময়—রাস্তা ভরা গাড়ির হর্ন, বাসের ধোঁয়া, দ্রুত হাঁটা মানুষের ভিড়। কেউ তাড়াহুড়ো করে রিকশা ধরছে, কেউ ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছে। শহরের সেই ব্যস্ততার মাঝেই রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন—ধূসর দাড়ি, মলিন পাঞ্জাবি, পায়ে পুরোনো স্যান্ডেল। হাতে একটি অ্যালুমিনিয়ামের থালা।
তিনি কারও পথ আটকে দিচ্ছিলেন না। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেন শহরের দ্রুত গতির ভেতরেও তিনি আলাদা এক নীরবতায় আটকে আছেন।
আমি তাকালাম।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চোখ সরিয়ে নিলাম—যেন কিছুই দেখিনি।
দশ-পনেরো কদম হাঁটার পর হঠাৎ নিজের কাছেই অদ্ভুত একটা প্রশ্ন জেগে উঠল—আমি কেন এমন করলাম? একজন মানুষকে দেখলাম, তারপর তাকে এমনভাবে পাশ কাটালাম যেন তিনি এই ভিড়ের অংশই নন। যেন তিনি শুধু রাস্তার একটি দৃশ্য, মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া একটি ছোট ঘটনা।
সত্যি বলতে কী, এমনটা শুধু আমি করি না। আমরা অনেকেই করি। রাস্তায় ভিক্ষুক দেখলে, ফুটপাথে বসে থাকা অসহায় মানুষ দেখলে, কিংবা কারও হাতে সাহায্যের থালা দেখলে আমরা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিই। কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ নামিয়ে ফেলি, কেউ ব্যস্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করি, কেউ অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি।
কিন্তু কেন?
কিছুক্ষণ ভেবে মনে হলো—এই চোখ সরিয়ে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে থাকে।
প্রথমত, আছে সাহায্য করতে না পারার দ্বিধা। একজন অভাবী মানুষ সামনে দাঁড়ালে আমাদের ভেতরে সঙ্গে সঙ্গে একটি ছোট সিদ্ধান্তের চাপ তৈরি হয়—কিছু দেব কি দেব না? দিলে কত দেব? না দিলে কি নিষ্ঠুর মনে হবে? এই ছোট দ্বিধাটাই অনেক সময় আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তাই আমরা পরিস্থিতিটাই এড়িয়ে যাই। চোখে চোখ পড়ার আগেই দৃষ্টি সরিয়ে নিই।
দ্বিতীয়ত, আছে অপরাধবোধ। একজন অভাবী মানুষকে দেখলে হঠাৎ নিজের জীবনটা অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমার মাথার ওপর ছাদ আছে, রাতে খাবার আছে, নিরাপদ ঘুম আছে। আর কারও কাছে হয়তো আজকের রাতটাই অনিশ্চিত। একই মোড়ে কেউ কফিশপে ঢুকছে, কেউ অফিস থেকে বাস ধরছে, আর কেউ থালাটা হাতে দাঁড়িয়ে আছে—এই পার্থক্যটা চোখ এড়ানো কঠিন।
এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ দাদুর কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, “ভিক্ষুক দেখলে চোখে চোখ রেখে কথা বলো। টাকা দিতে না পারলেও মানুষ বলে ডাকো।” সেই কথাটা কতদিন ভুলে ছিলাম! শহরের ব্যস্ত জীবনে কখন যেন আমরা এই ছোট মানবিক শিক্ষাগুলো হারিয়ে ফেলি।
তৃতীয়ত, আছে ভাগ্যের অদৃশ্য আয়না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যেন আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখি আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের সুবিধা, আমাদের বর্তমান জীবন। কিন্তু সেই আয়নার ভেতরে আরেকটি প্রশ্নও লুকিয়ে থাকে—যদি ভাগ্য অন্যরকম হতো? যদি জীবনের কোনো ছোট দুর্ঘটনা সবকিছু বদলে দিত?
এই প্রশ্নটা অস্বস্তিকর। তাই আমরা আয়নাটার দিকেই তাকাতে চাই না।
আমি হাঁটতে হাঁটতে আবার পিছনে তাকালাম। বৃদ্ধটি এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। মানুষজন পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ তাকাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছে না। শহরের ব্যস্ততা তার চারপাশে চলতেই আছে।
আমি একটু থামলাম।
হঠাৎ বৃদ্ধটি থালাটা একটু এগিয়ে ধরে শান্ত গলায় বললেন,
“ভাত খাবেন, ভাই?”
বাক্যটি খুব ছোট। তাতে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো তাগাদা নেই। যেন তিনি শুধু উপস্থিত আছেন—এই শহরের মাঝখানে একজন মানুষ হিসেবে।
আমি কিছু বললাম না। কিন্তু এবার চোখ সরালাম না।
অদ্ভুতভাবে মনে হলো, এতক্ষণ আমি মানুষটাকে দেখছিলাম না—শুধু একটি পরিস্থিতিকে দেখছিলাম। অথচ সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ, যারও হয়তো কোনো সময় পরিবার ছিল, কাজ ছিল, পরিচিত জীবন ছিল।
আমরা শহরের ভিড়ে খুব সহজেই মানুষকে শ্রেণিতে ভাগ করে ফেলি—অফিসগামী, দোকানদার, পথচারী, ভিক্ষুক। এই ভাগ করার সুবিধা হলো, এতে আমাদের ভাবতে হয় না। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।
কিন্তু এই সহজীকরণের মধ্যেই একটা বিপদ আছে। আমরা ধীরে ধীরে মানুষের মানবিক উপস্থিতিকে ভুলে যাই।
ব্রিজের নিচে, ফুটপাথে, বাসস্ট্যান্ডে—অনেক মানুষ বসে থাকে। তাদের পাশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার মানুষ হেঁটে যায়। কিন্তু খুব কম মানুষ থামে। কারণ থামা মানে একটু ভাবা, একটু অনুভব করা, একটু অস্বস্তি মেনে নেওয়া। আর আমরা অস্বস্তি এড়িয়ে চলতেই অভ্যস্ত।
হয়তো এখানেই আমাদের ভয়ের আসল রূপ লুকিয়ে আছে।
আমরা কি সত্যিই অভাবী মানুষকে ভয় পাই?
নাকি আমরা ভয় পাই সেই অনুভূতিকে, যা তাদের দেখে আমাদের ভেতরে জেগে ওঠে? অপরাধবোধ, অনিশ্চয়তা, আর ভাগ্যের ভঙ্গুরতা।
অভাবী মানুষটি তখন শুধু একজন মানুষ থাকে না; তিনি হয়ে ওঠেন এক ধরনের আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের জীবন দেখি—আর সেই দেখাটাই কখনও কখনও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
সেদিন বনানীর মোড়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা মানুষটাকে এড়িয়ে যাই না। আমরা এড়িয়ে যাই সেই প্রশ্নটাকে, যা তার উপস্থিতি আমাদের সামনে তুলে ধরে।
আর সেই কারণেই হয়তো শহরের ভিড়ে আমরা এত সহজে চোখ সরিয়ে নিই।
মানুষটাকে নয়—নিজের ভেতরের কিছু একটাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। হয়তো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।