বিপদের দিনে আপনজন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৬ অক্টোবর ২০২৬
একজন নারী যখন স্বামীর সংসারে ভালো থাকেন, তখন তাঁকে ঘিরে অনেক সম্পর্ক সক্রিয় থাকে। শ্বশুরবাড়ির মানুষ, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন—অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু, বিচ্ছেদ কিংবা সংসারে বড় কোনো বিপর্যয় নেমে এলে সেই সম্পর্কগুলোর কিছু কিছু বদলে যেতে শুরু করে। যে মানুষগুলো একসময় তাঁকে আপন বলে পরিচয় দিত, তাদের অনেকেই তখন দূরত্ব বজায় রাখতে শেখে।
এই পরিবর্তন শুধু মানুষের অনুপস্থিতিতে ধরা পড়ে না; ধরা পড়ে তাদের আচরণেও। আগে যে সমস্যার কথা মন খুলে বলা যেত, এখন তা বলার আগে দশবার ভাবতে হয়। আগে যে মানুষটি খোঁজ নিতেন, তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখান। কেউ কেউ সহানুভূতি প্রকাশ করেন, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার সময় পিছিয়ে যান। তখন একজন নারী বুঝতে পারেন, সম্পর্কের পরিচয় থাকা আর সম্পর্কের দায়িত্ব পালন করা এক বিষয় নয়।
সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো, স্বামীর সংসারে সংকট দেখা দিলে একজন নারী সব সময় বাবার বাড়িতেও নিঃশর্ত আশ্রয় পান না। নিজের বাবা-মা কিংবা ভাইবোন ভালোবাসলেও তাদের সংসার, আর্থিক সামর্থ্য ও পারিবারিক হিসাবের কারণে সহযোগিতার সীমা থাকতে পারে। কখনো তাঁকে বলা হয়, মানিয়ে নিতে; কখনো নিজের কষ্ট চেপে আবার ফিরে যেতে বলা হয়। আবার কোথাও তিনি আন্তরিক আশ্রয়ও পান। অর্থাৎ, বাবার বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ি—কোনো পরিচয়ই একা নিশ্চয়তা দেয় না যে একজন নারী সেখানে সম্মান ও নিরাপত্তা পাবেন।
বিপদের সময় এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। প্রয়োজনের মুহূর্তে হয়তো একজন নারী সামান্য আর্থিক সহায়তা চান, সন্তানের পড়াশোনার জন্য সহযোগিতা চান কিংবা অসুস্থতার সময় পাশে কাউকে চান। তখন অনেকেই পরামর্শ দিতে এগিয়ে আসেন, কিন্তু বাস্তব দায়িত্ব ভাগ করে নিতে চান না। তাঁর জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতামত দেওয়ার মানুষ অনেক থাকে, অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি বহন করার সময় তাঁকে একাই দাঁড়াতে হয়। সহানুভূতির কথা বলা সহজ; অন্যের কঠিন সময়ের কিছুটা ভার নিজের কাঁধে নেওয়াই আসল সহযোগিতা।
তবে সব দোষ সমাজের ওপর চাপিয়ে দিলেও বাস্তবতার পুরোটা বলা হয় না। একজন স্বামীও তাঁর স্ত্রীর জীবনে নিরাপত্তা কিংবা অনিরাপত্তার কারণ হতে পারেন। স্বামী হলেই কেউ সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠেন না। যে মানুষটি স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেন, বিপদে পাশে থাকেন, তাঁর সম্মান রক্ষা করেন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেন, তিনিই প্রকৃত জীবনসঙ্গীর পরিচয় দেন। অন্যদিকে, সম্পর্কের নাম ব্যবহার করে অপমান বা নির্যাতন করা হলে শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সেই কষ্ট মেনে নেওয়াকে ভালোবাসা বলা যায় না।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—একজন নারীর নিরাপত্তা কি কেবল তাঁর স্বামীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করবে? স্বামীহীন হওয়া কিংবা দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কি তাঁর সামাজিক মর্যাদা কমিয়ে দেয়? একজন মানুষের জীবনের পরিস্থিতি বদলাতে পারে, কিন্তু তার সম্মান পাওয়ার অধিকার বদলে যায় না। একজন নারীকে তাঁর বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে বিচার না করে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা সমাজের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে নারীর নিজের শক্তি গড়ে তোলাও জরুরি। আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়ার চেষ্টা, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস, বিশ্বস্ত মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা তাঁকে কঠিন সময় সামলাতে সাহায্য করে। এর অর্থ এই নয় যে তাঁকে সবকিছু একাই করতে হবে। বরং তাঁর পাশে এমন মানুষ থাকা উচিত, যাঁদের সহযোগিতা করুণা নয়, সম্মান থেকে আসে।
জীবনে স্বামী, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা মূল্যবান। কিন্তু সেই ভালোবাসার অর্থ নিজের অস্তিত্বকে অন্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল করে তোলা নয়। সম্পর্কের সৌন্দর্য তখনই, যখন মানুষ বিপদে একে অপরকে আগলে রাখে, অথচ কারও আত্মসম্মান কেড়ে নেয় না।
একজন নারী স্বামীর পাশে থাকলে যেমন সম্মানের যোগ্য, স্বামীহীন হলেও তিনি ততটাই সম্মানের যোগ্য। তাঁর পরিচয় শুধু কারও স্ত্রী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ, তাঁর নিজের অনুভূতি, অধিকার ও ভবিষ্যৎ আছে।
শেষ পর্যন্ত, দুঃসময় শুধু কে পাশে থাকল আর কে সরে গেল, সেই হিসাব দেয় না; সম্পর্কের প্রকৃত অর্থও বুঝিয়ে দেয়। আর যে নারী সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজের মূল্য চিনতে শেখেন, তিনি শুধু অন্যকে চিনতেই শেখেন না—নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার সাহসও অর্জন করেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।