ডানায় ধুলো, শহরে মুখোশ — আমরা আসলে কতটা জীবিত?
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী।২৩ নভেম্বর ২০২৫
কল্পনা করো—ক্লান্ত, ধুলো লাগা ডানায় একটা প্রজাপতি ভুল করে শহরের মাঝখানে এসে বসেছে।
আলো, কোলাহল, ধোঁয়া, কংক্রিট—চারদিকেই শুধু তাড়া তাড়া একটি বিশাল শব্দ।
সে কাঁপতে কাঁপতে চারপাশ দেখে। কোথাও নেই ঘাস, নেই ফুল, নেই হাওয়ার নরম শ্বাস।
ক্ষণিক থেমে হয়তো ফিসফিস করে বলবে—
“এইভাবে বাঁচার নাম জীবন হতে পারে?”
আমরা সেটা শুনে হেসে উঠবো। কারণ আমরা ভয় পাই—কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে, আমরা আদৌ বেঁচে আছি কি না।
ভোরে ঘুম ভাঙে অ্যালার্মে, পাখির ডাক নয়।
চায়ের কাপে হাত যেতেই ফোনে নোটিফিকেশন, ইমেইল, ডেডলাইন—দিনটা শুরুই হয় যুদ্ধ দিয়ে।
নিজস্ব চিন্তার সঙ্গে এক মিনিট একা থাকা অসহ্য হয়ে গেছে— কারণ চুপ করলে যে শূন্যতা উঠে আসে, সেটা সামলানোর সাহস আমাদের আর নেই।
কাজ, টার্গেট, হুড়োহুড়ি, তুলনা— জীবনকে আমরা মেপে ফেলেছি সংখ্যায়।
সপ্তাহান্তে বিশ্রাম নয়—শরীর চুপসে যায়, মন আর কিছু অনুভব করতে চায় না। পরিবার একসাথে থাকে কিন্তু কারও ভেতর কারও প্রবেশ নেই।
বন্ধুরা আছে, কিন্তু আড্ডা নেই—শুধু মাত্র শেয়ার করে হাসির অভিনয়।
রাতে শুয়ে চোখ বন্ধ করলে একটা মুহূর্ত আসে—
কোনো আওয়াজ নেই, ভিড় নেই, ডেডলাইন নেই…
আর ঠিক তখনই বুঝি:
আমরা ক্লান্ত শরীর নই — ভেঙে যাওয়া মন।
শৈশবের কথা মনে আছে?
বিকেলবেলা ছাদে দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা, হাসি—
জীবন তখন কত সরল ছিল। কিছুই ছিল না, তবুও সব ছিল।
এখন?
সবকিছু আছে—তবুও কিছুই লাগে না।
বৃষ্টিতে ভিজে নির্ভার হাঁটা হতো—
এখন ভিজলে ভয় লাগে—মিটিং নষ্ট হবে, পোশাক নষ্ট হবে, সময় নষ্ট হবে।
জীবন সুন্দর থেকে হিসাবি হয়ে গেছে।
রাতে ছোটবেলায় গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়তাম।
এখন ঘুমানোর আগে ফোন দেখি—আশা করি কেউ মেসেজ করেছে, কেউ মনে করেছে, কেউ পাশে আছে।
আর বেশিরভাগ রাতই শেষ হয় একই কথায়—
“আজও কেউ ছিল না।”
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দারিদ্র্য এখন অর্থহীনতা নয়—
আবেগের দারিদ্র্য।
বাইরে সফলতার মুখোশ, ভেতরে নীরব কান্না।
যা বলি — “ব্যস্ত আছি।”
যা বলতে চাই — “একটু পাশে থাক।”
কিন্তু সাহস হয় না—দুর্বল দেখানোর ভয়।
ফ্ল্যাট আছে। গাড়ি আছে। টাকা আছে।
কিন্তু এমন একজন নেই, যাকে আলিঙ্গন করে বলতে পারি—“আজ ভেঙে পড়েছি।”
জিম আছে, ডায়েট আছে। কিন্তু মনের ওজন কমে না।
লাইক আছে, কমেন্ট আছে। কিন্তু কেউ সত্যিকারে খেয়াল করে না।
চূড়ান্ত নির্মম সত্য — শহর আমাদের মানুষ থেকে মেশিন বানিয়ে ফেলেছে। চোখে লক্ষ্য আছে, কিন্তু হৃদয়ে আলো নেই।
প্রজাপতি যখন বলেছে —
“মিছে।”
সে ফুল বা গাছের জন্য আহাজারি করেনি।
সে শোক করছিল—
আমরা সবকিছু পেতে গিয়ে নিজেরাই হারিয়ে ফেলেছি।
সমস্যা শহর নয়—সমস্যা আমাদের বেঁচে থাকার স্টাইল।
জীবন মানে শুধু আয় নয় —কোনো একজনের পাশে থাকা, কাউকে সত্যিকারে বোঝা,
চোখে চোখ রেখে বলা — “তুমি একা নও।”
এই স্পর্শটাই এখন সবচেয়ে দুর্লভ।
হয়তো এখন দরকার —
• থামা
• নিজের দিকে তাকানো
• যাদের ভালোবাসি, তাদের প্রতি কৃপণ না হওয়া
• নিজের ভেতরের মানুষটার হাত ধরা
কারণ শহর বদলাবে না —
কিন্তু আমরা চাইলে কীভাবে বাঁচবো সেটাই বদলাতে পারি।
প্রজাপতি উড়ে যাবে—শহর তার জায়গা নয়।
কিন্তু তার রেখে যাওয়া কথাটি টিকে থাকবে—
“বেঁচে ওঠার আগে বেঁচে থাকা শিখো।”
আর এখন প্রশ্ন একটাই— শহর আছে, সফলতাও আছে…
কিন্তু তুমি কোথায়?
তুমি কি বেঁচে আছো—নাকি শুধু চলছ?
লেখাটা যাদের মনে লাগলো, তাদের একটা প্রশ্ন —
শহর তো আছে, সফলতাও আছে… কিন্তু মানুষটা এখন কোথায়?
#অতিমাত্রায়শহুরে #মনখেপা_জীবন #মানুষহওয়া_ভুলে_গেছি
#শহরেরশূন্যতা #নীরবচিৎকার #ভালোথাকারঅভিনয়
#জীবনেবিরতি_দাও #মনকেশুনো #মানুষফেরতো_মানুষহয়ে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।