বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকীত্ব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলাম | ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
আমার বাবার চশমাটা ভাঙা। ডান দিকের কাঁচটা ফাটল ধরেছে, তিনি সেলোটেপ লাগিয়ে চালাচ্ছেন। আমি বলেছিলাম, "নতুন কিনে দিই?"
উনি হেসেছেন—সেই হাসি যেটা আর এত আসে না। বলেছেন, "এতদিনের সঙ্গী, ছেড়ে দেব কেমন করে?"
আমি কিছু বুঝিনি তখন। এখন বুঝি।
সেই সঙ্গীটাই আমি নই। গত ছয় মাসে তিনবার দেখেছি উনি সকালে ঘুম থেকে উঠে ছাদে যান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন। কী দেখেন সেখানে?
আমি ভেবেছিলাম, হয়তো রাস্তা দেখছেন। না, তা নয়। দেখছেন স্কুলগামী বাবা-মায়েদের। যারা ছোট ছোট হাত ধরে হাঁটে। যারা ছেলেমেয়েদের কাঁধে হাত রাখে, যখন রাস্তা পার হয়।
একদিন আমি চুপচাপ উনার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বাবা টের পাননি। পাঁচ মিনিট পর যখন ঘুরলেন, চমকে উঠলেন। চোখে কিছু একটা ছিল—জল নাকি ঘাম, বলতে পারি না।
বলেছেন, "তোর ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। তুই যখন এত ছোট ছিলি..."
আমি বাধা দিয়েছিলাম। মিটিং ছিল, তাড়া ছিল। বলেছিলাম, "বাবা, পরে কথা বলি।"
এখনো সেই "পরে" আসেনি।
শহরের ফ্ল্যাটগুলোতে একটা নীরব অভ্যাস তৈরি হয়েছে। সকালে মা উঠেন, নিজের জন্য চা বানান—একটা কাপ, শুধু তার জন্য। বাবা উঠেন, ছাদে চলে যান। দুপুরে খান একসাথে, কিন্তু টিভি চলতে থাকে। কোনো সিরিয়াল নয়, সংবাদ চ্যানেল। কারণ কথা বলার মতো কিছু আর নেই। বা থাকলেও বলার সাহস নেই।
মা ফোন ধরার আগে দুবার নিঃশ্বাস নেন। প্রথমবার ভাবেন, আজ কী বলবেন যা আমার কাজে বাধা দেবে না। দ্বিতীয়বার ভাবেন, কতক্ষণ বলবেন—যাতে আমার ফোনের ব্যাটারি খরচ না হয়, বা আমি বিরক্ত না হই।
আমি কখনো এটা বুঝিনি। এখন বুঝছি।
গত বছর ঈদে বাড়ি গিয়েছিলাম। তিন দিনের জন্য। মা রাতে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোর বন্ধু রফিক এখন কী করে?"
আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। রফিকের কথা কেন? রফিক তো বিশ বছর আগের বন্ধু। কলেজ ছাড়ার পর দেখা হয়নি। আমি বলেছিলাম, "জানি না, মা। ঘুমাও না, কাল অফিস আছে।"
মা চুপ করে গেছেন। আমি শুয়ে পড়েছি। ফোনে কাজের ইমেইল দেখেছি। পরদিন সকালে দেখি, মা আমার পুরোনো অ্যালবাম ঘেঁটে রফিকের ছবি বের করেছেন। ছবিটা টেবিলে রাখা আছে।
আমি জিজ্ঞেস করিনি কেন। মা বলেননি কেন খুঁজেছেন। আমরা দুজনে শুধু দেখেছি সেই ছবি। রফিক হাসছে, আমি হাসছি, আমাদের বয়স ছিল বিশ।
সেই "কেন"-টা এখনো আমার মনে আছে। অপরাধের মতো।
আমার এক বন্ধু আছে—ফারহান। সে প্রতিদিন রাত দশটায় দশ মিনিট হাঁটে। জিমে নয়, বাড়ির গলিতে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন।
বলেছে, "আমার বাবা ফোনে বলেছিলেন, পায়ে ব্যথা করে, আর হাঁটতে পারি না। এখন আমি রোজ দশ মিনিট হাঁটি। যাতে বাবাকে বলতে পারি, আমিও হাঁটলাম আজ।"
আমি একবার করেছিলাম এটা। বাবাকে ফোন করেছিলাম, বলেছিলাম হাঁটলাম। দুই মিনিট পর আমার ম্যানেজার মেসেজ করেছেন। জরুরি কাজ। আমি ফোন রেখে দিয়েছিলাম।
মাকে বলেছিলাম পরে, "বাবার সাথে দুই মিনিট কথা বলেছিলাম।" মা হেসেছেন। বলেছেন, "ব্যস্ত মানুষ, কী করবি?" কিন্তু চোখ নামিয়ে নিয়েছেন। আমি দেখেছিলাম তখন। এখন বুঝি, সেটা কী ছিল।
আমার বাবার ডাক্তার বলেছেন, উনি রাতে ঘুমান না। ঘুমের ওষুধ খান, কিন্তু তিনটার আগে চোখ বন্ধ হয় না। ডাক্তার জানেন না কেন। আমি জানি—বা জানার চেষ্টা করছি।
রাত হলে ঘরে শুধু দুজন থাকে। কথা বলার মানুষ নেই—মা ঘুমিয়ে আছেন। টিভি দেখা যায় না—সবাই ঘুমিয়েছে। অন্ধকারে শুধু শ্বাসপ্রশ্বাস থাকে। আর স্মৃতি।
আমার মায়ের হাত কাঁপে। চা'র কাপ ধরতে গেলে দেখা যায়। উনি বলেন, "বয়স হয়েছে।" ডাক্তার বলেছেন, শারীরিক কোনো সমস্যা নেই। মানসিক চাপ থাকলে এটা বাড়ে।
আমি জানি, কখন বাড়ে। যখন ফোনের পর্দায় আমার নাম দেখেন, কিন্তু আমি ধরি না। যখন আমার ভয়েস মেইলে আমার ব্যস্ততার ওজর শুনেন। তখন।
আমাদের প্রজন্ম শিখেছে—বাবা-মাকে ভালোবাসা মানে টাকা পাঠানো, ওষুধ কেনা, মাসে একবার ভিডিও কল করা।
কিন্তু হাত ধরা?
গল্প শোনা?
"পরে বলো" না বলে এখনই শোনা?
এটা আমাদের শেখানো হয়নি।
আমার মেয়েরা দেখছে, আমি তার দাদুর সাথে কীভাবে কথা বলি। দেখছে, আমি কীভাবে ফোন কেটে দিই। শিখছে। কাল সে আমার সাথেও এমন করবে। এটা নিশ্চিত। কারণ আমরা শিখি দেখে দেখে।
আজ রাতে ফোন দেব। না, আজ নয়—এই মুহূর্তে।
বাবার চশমার কথা জিজ্ঞেস করব। মায়ের হাত কেন কাঁপে। রফিকের ছবি কেন খুঁজেছিলেন। আমি শুনব। শুধু শুনব। কারণ তারা আমার বাবা-মা নন শুধু, তারা আমার সাক্ষী। যারা দেখেছেন আমি কীভাবে হাঁটতে শিখেছি। কীভাবে পড়তে শিখেছি। কীভাবে একা হয়ে গেছি।
আমার সব অর্জন—এই ফ্ল্যাট, এই গাড়ি, এই পদবি—এর কোনো মানে নেই যদি তারা একা থাকেন। কারণ বিজয়ের অর্থ হলো, যারা দেখেছেন তোমার শুরু, তারা থাকবে তোমার শেষে।
আজ রাতে ফোন দেব। আসলেই দেব।
#বৃদ্ধবাবামা #পরিবার #মানবিকতা #সমাজ #সচেতনতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।