কাঁচের ভবনের সামনে অদৃশ্য হওয়া মানুষটি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলম | ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬
সকাল আটটার অফিসপাড়ায় দুটি শব্দের স্তর কাজ করে। একটি যান্ত্রিক—গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, দ্রুত পায়ের ছাপ, ফোনে কথার স্বর—"হ্যাঁ, অবশ্যই, আমি আপনাকে জানাব।" অন্যটি নীরব—ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের শ্বাসপ্রশ্বাস, যার হাতে ভাঙা কোণার ফাইল, যার ভেতর তিন বছরের পুরোনো জীবনবৃত্তান্ত। উপরে নীল কালিতে লেখা—"প্রত্যাশিত বেতন: আলোচনাসাপেক্ষ।" শেষ লাইনের ফোন নম্বরটি এখন মৃত। বোধহয় সংযোগ বিচ্ছিন্ন, না হয় তিনি নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এই দ্বৈত শব্দের স্তরই আমাদের সমাজের বর্গবিন্যাসকে উন্মোচন করে।
কাঁচের ভবনের ভেতরে ঢুকে যায় এক শ্রেণীর মানুষ। তাদের চোখে ঘুম কম, কিন্তু আত্মবিশ্বাস বেশি—অন্তত দেখাতে পারেন। তাদের পোশাক, জুতো, ঘড়ি—সবই একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ভাষায় কথা বলে। এই ভাষায় দক্ষতা থাকলে কাঁচের দেয়াল আপনাকে ঢোকায়, না হলে ফুটপাথেই রেখে দেয়।
এখানেই প্রশ্ন উঠে—আমরা কী মাপদণ্ডে মানুষকে মাপি?
আমাদের ঘোষিত মানদণ্ড—পরিশ্রম, যোগ্যতা, প্রতিভা। কিন্তু বাস্তব পরিমাপক—মাসিক আয়। এই শহরে ব্যক্তিকে তার নাম দিয়ে নয়, বেতনের রশিদ দিয়ে চেনা হয়। আয় যত বেশি, সামাজিক দৃষ্টি তত উঁচু। বেকারত্ব মানে ধীর অদৃশ্যতা—প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপের উত্তর কমে, তারপর বন্ধুত্বের ডাক, অবশেষে নিজের চেহারা আয়নায় অচেনা লাগে।
এই অদৃশ্যতার প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণযোগ্য। এতে কোনো শব্দ নেই, প্রতিবাদ নেই—শুধু নীরবতা। আর নীরবতা ঘনীভূত হয়ে একাকিত্বে পরিণত হয়।
উৎপাদনবাদ ও মানবমূল্যের সংঘাত
গত বছর এক আত্মীয়ের উক্তি বিশ্লেষণের দাবি রাখে—"চাকরি না থাকলে মানুষ মানুষ থাকে না।" এই বাক্যটি আমাদের সমাজের গভীর বৈপরীত্য উন্মোচন করে। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, উৎপাদনক্ষম যন্ত্র হিসেবে দেখি। যন্ত্র চালু থাকলে মূল্য, বন্ধ হলে বর্জ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মানববিদ্বেষী যুক্তি—মানুষের মূল্য তার বিনিময় মূল্যে নির্ধারিত হয়।
দারিদ্র্য শুধু আর্থিক সংকট নয়, এটি মর্যাদার সংকট। একজন শ্রমিক কাজ হারালে শুধু আয় হারান না—তিনি তার সামাজিক পরিচয় হারান। আমার এক আত্মীয়ের ক্ষেত্রে দেখেছি—কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তিনি নিজেকে "বেকার" বলে পরিচয় দিতেন। "বসে আছি" বা "অপেক্ষা করছি" নয়—বেকার। শব্দটিতে একটি নিঃশব্দ অপরাধবোধ কাজ করে, যা ব্যক্তিকে অপরাধীতে পরিণত করে।
ভাষার বিকৃতি ও ক্ষমতার সমীকরণ
চায়ের দোকানের সংলাপটি বিশ্লেষণী—"কেমন আছেন?" নয়, প্রশ্ন হয় "কাম কি খবর?" কাজের সংবাদ না থাকলে আপনি ব্যর্থ, ব্যর্থ মানে অপ্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় মানে বোঝা। এই ভাষার শৃঙ্খলা ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে খালি করে। আমার আত্মীয়ের ক্ষেত্রে দেখেছি—কথা কমতে কমতে একদিন বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেন।
ক্ষুধা ও লজ্জার পার্থক্যও বিশ্লেষণযোগ্য। ক্ষুধা বলা যায়, লজ্জা বলা যায় না। কারণ সাহায্য চাইলে শোনা যায়—"লজ্জা করে না?" এই লজ্জাই মানুষকে অদৃশ্য করে—প্রথমে ভিড় থেকে, তারপর নিজ ঘর থেকে, অবশেষে নিজের থেকে।
মধ্যবিত্তের নিরাপত্তাহীনতা
সবচেয়ে বেশি ভয় পায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী। কারণ তারা জানে—একটি চাকরি হারালেই সব শেষ। বিদ্যুতের বিল লাল হয়, স্কুলের ফি জমে, ঔষধের দোকানে বাকির খাতা খোলে। এই ভয় তাদের দৌড়তে বাধ্য করে। আরও দৌড়ায়, আরও একটু।
কিন্তু এই দৌড়ের মধ্যে একটি বিপজ্জনক বিশ্বাস জন্ম নেয়—মানুষ মানে আয়। একদিন আয় বন্ধ হলে তারা অবাক হন—এতদিন যাকে জীবন ভেবেছেন, তা আসলে ভয় ছিল, শুধু ভয়।
ব্যর্থতার সামাজিক নির্মাণ
আমরা দরিদ্রকে কেন ব্যর্থ ভাবি? কারণ এতে আমাদের সুবিধা হয়। যদি ভাবি—"ও চেষ্টা করেনি, তাই গরিব"—তাহলে আমাদের অপরাধবোধ কমে। কিন্তু এই ভাবনা বাস্তবতা লুকায়।
বাস্তবতা হলো—সবাই সমান স্থান থেকে শুরু করে না। কারও জন্ম ঋণে, কারও স্কুলে শিক্ষক নেই, কারও শরীর অসুস্থ, কারও কারখানা মালিকের ইচ্ছায় বন্ধ। তবু আমরা একই শেষরেখা ধরে বিচার করি। এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা।
দানবাদ বনাম কাঠামোগত পরিবর্তন
আমাদের সমাধানও বিশ্লেষণযোগ্য। আমরা দান করি, ছবি তুলি, পোস্ট দিই। কিন্তু কাঠামো বদলাই না। একদিন সাহায্য করে ভাবি দায়িত্ব শেষ, পরদিন সেই মানুষ আবার লাইনে দাঁড়ায়। করুণা সমস্যার সমাধান নয়। সম্মান ও সুযোগ ছাড়া কোনো সমাজ টেকসই নয়।
সমাধানের কাঠামো
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন। ডিগ্রি নয়, দক্ষতা প্রয়োজন। যাতে চাকরি হারালেও নতুন কাজ শুরু করা যায়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা বিলাসিতা নয়। অসুস্থতা, বেকারত্ব, বার্ধক্য—এগুলো জীবনের অংশ। এই ঝুঁকি একা বহন করা যায় না।
তৃতীয়ত, সম্মানের সংস্কৃতি। যে কোনো সৎ কাজ—রিকশা চালানো, ক্ষেত চাষ, দোকান করা—সবই সমাজের ভিত্তি। কাজের মর্যাদা না শেখা পর্যন্ত মানুষের মর্যাদা ফিরবে না।
গত সপ্তাহে বৃষ্টির বাসস্ট্যান্ডে একজনকে দেখেছি। ফাইল ভিজে গেছে, কাগজ শুকোচ্ছিলেন হাতের উষ্ণতায়। কেউ খেয়াল করেনি। আমিও করিনি। পরে প্রশ্ন উঠেছে—কেন করিনি?
কাঁচের ভবনের আলো তখনও জ্বলছিল। ভাবলাম—যে সমাজ মানুষকে টাকার ওজনে মাপে, সে একদিন নিজের মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলে। তখন ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে আলো থাকে, কিন্তু মানুষ থাকে না। থাকে না।
এটি শুধু একটি ব্যক্তির কাহিনী নয়—এটি একটি সামাজিক কাঠামোর বিশ্লেষণ, যেখানে মানবমূল্য অর্থনৈতিক মূল্যে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
#টাকায়মানুষ_নয় #মানবিক_অর্থনীতি #মর্যাদার_লড়াই #নীরব_দারিদ্র্য #সমাজের_পুনর্বিবেচনা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।