যে চিঠিগুলো কখনো শেষ হয় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। মে ১২, ২০২৬
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর “ছেঁড়া চিঠির নায়ক” প্রথম পড়ায় সীমিত, প্রায় ব্যক্তিগত এক অভিজ্ঞতার মতো লাগে। শব্দ কম, আওয়াজ কম। কিন্তু কিছুদূর গেলে বোঝা যায়—গল্পটা কোনো এক জীবনের ধারাবিবরণী নয়; বরং ছড়িয়ে থাকা অনুভূতির খণ্ডচিত্র। যেন টেবিলের উপর কয়েকটা পুরোনো চিঠি ছড়ানো, কোনোটার কোণা ভাঁজ হয়ে গেছে, কোথাও কালি ছোপ লেগে আছে, কোথাও বাক্য হঠাৎ থেমে গেছে। পাঠক সেই টুকরোগুলো জোড়া দিতে বসে।
চিঠি এখানে কেবল মাধ্যম নয়, বরং ভাঙনের চিহ্ন। সাধারণত চিঠি মানে পৌঁছানোর চেষ্টা। এখানে পৌঁছানো বারবার ব্যাহত হয়। একটি জায়গায় নায়ক লিখতে গিয়ে থামে—“তোমাকে বলতে গিয়ে…”—তারপর আর কিছু নেই। সাদা জায়গা। যেন কলম কাগজ ছুঁয়ে থেমে গেছে, আর হাত সরেনি। এই অসমাপ্ততা কোনো কাকতাল নয় বলেই মনে হয়; বরং ইচ্ছাকৃতভাবে বাক্যকে অর্ধেক রেখে দেওয়ার প্রবণতা। ফলে যোগাযোগের বদলে অস্বস্তি তৈরি হয়—কী বলা হচ্ছিল, সেটার চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে ওঠে কেন বলা গেল না।
নায়কের অবস্থান তাই একটু দোদুল্যমান। সে বলতে চায়—এটা বোঝা যায়। কিন্তু শব্দ গলা পর্যন্ত এসে আটকে যায়, যেন নিজেই নিজের বাক্যের দাঁড়ি টেনে দেয়। এই দ্বিধার ভেতর ভয় থাকতে পারে, আবার একধরনের আত্ম-সংযমও। কোনটা কাজ করছে, তা স্পষ্ট নয়। লেখক বিষয়টা খোলা রাখেন। ফলে নায়ককে বোঝার কাজটা পাঠকের উপরেই এসে পড়ে।
এই জায়গাটায় মনস্তত্ত্বের প্রসঙ্গ এড়ানো যায় না। পাঠক মাত্রই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে পুরোটা বলা সহজ নয়। কখনো প্রতিক্রিয়ার ভয়, কখনো নিজের দুর্বলতা প্রকাশের অস্বস্তি। ফলে বাক্যগুলো পূর্ণতা পায় না; আধখানা অবস্থায় পড়ে থাকে, ঠিক যেমন খামের ভেতর ঢোকানো হয়নি এমন চিঠি টেবিলে পড়ে থাকে। “ছেঁড়া চিঠির নায়ক” সেই আধখানা বলার অভ্যাসটাকেই কেন্দ্র করে এগোয়।
বর্ণনাভঙ্গি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি আবেগে যান না। তিনি দৃশ্য দেন, কিন্তু পুরোটা আঁকেন না। বরং খানিকটা ফাঁকা মার্জিন রেখে দেন—যেখানে পাঠক নিজে কিছু লিখে নেয়। এই কৌশল কাজও করে, বিশেষ করে যেখানে স্মৃতির মতো ঝাপসা ভাব দরকার। পুরোনো কাগজে লেখা পড়তে গেলে যেমন কিছু অক্ষর স্পষ্ট থাকে, কিছু মিলিয়ে যায়, এখানেও তেমন। তবে এই একই ভঙ্গি মাঝে মাঝে দূরত্ব তৈরি করে। পাঠক কাছে যেতে চায়, কিন্তু যেন পাতার ওপর একটা পাতলা কুয়াশা রয়ে যায়।
নায়ককে প্রচলিত অর্থে নায়ক বলা যায় কি না, তা নিয়েও সন্দেহ থাকে। তার কোনো দৃশ্যমান অর্জন নেই। বরং সে বহন করে—অপ্রকাশিত বাক্য, না-পাঠানো চিঠি, অর্ধেক স্বীকারোক্তি। এই বহন করার ভঙ্গিটা নীরব, কিন্তু স্থায়ী। অনেকটা এমন, যেন ব্যাগের ভেতর পুরোনো চিঠি রাখা—ফেলা যায় না, আবার খুলেও দেখা হয় না।
কেন?
এই প্রশ্নটার সহজ উত্তর লেখায় নেই। লেখক সেটি দিতে চানও না বলে মনে হয়।
নীরবতার ব্যবহার এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যা লেখা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি রয়ে গেছে কাগজের সাদা অংশে। কোথাও শুধু কালির হালকা দাগ, যেন শুরু হয়েছিল কিন্তু শেষ হয়নি। এই না-লেখা জায়গাগুলোই অর্থ তৈরি করে। তবে এটাও সত্যি—সব পাঠক এই ইঙ্গিত ধরতে পারবেন, এমন নয়। কারও কাছে এটা সূক্ষ্ম মনে হতে পারে, কারও কাছে অসম্পূর্ণ।
সময় প্রসঙ্গটা আলাদা করে চোখে পড়ে। চিঠি পুরোনো হয়, কাগজ ক্ষয়ে যায়। একটি জায়গায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়—লেখা মুছে গেছে, শুধু দাগ রয়ে গেছে। সময় এখানে শুধু পটভূমি নয়; এটি লেখার গঠনের অংশ। যা বলা হয়েছিল, তা টিকে থাকে না; কিন্তু বলার চেষ্টা—তার চিহ্ন—কোনোভাবে থেকে যায়। ফলে নায়ক তার চিঠি হারালেও, যে বাক্য শুরু করেছিল, তার অর্ধেকটা গলায় কাঁটার মতো আটকে থাকে।
শেষ পর্যন্ত এসে মনে হয়, এই লেখাটি কোনো সমাধান দিতে চায় না। বরং পাঠককে এমন এক অবস্থায় রেখে যায়, যেখানে প্রশ্নগুলো খোলা থাকে। ছেঁড়া চিঠি জোড়া লাগে না—এটা জানা কথা। তবু প্রশ্ন থাকে, জোড়া লাগানোটা আদৌ দরকার কি না। নাকি এই কাটা-ছেঁড়া, এই সাদা ফাঁক—এগুলোই পড়ার আসল অভ্যাস হয়ে গেছে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।