তালা লাগানো দরজার সামনে বারবার ফেরা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
১৯ অক্টোবর ২০২৬
সকালে অফিসে যাওয়ার সময় একজন মানুষ দরজায় তালা দিলেন। চাবি ঘুরিয়ে হাতল ধরে টেনেও দেখলেন। দরজা বন্ধ। তবু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হলো, তালাটা কি ঠিকমতো লাগানো হয়েছে?
তিনি ফিরে গেলেন।
আবার পরীক্ষা করলেন। তালা ঠিকই আছে। এবার নিশ্চিন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু রাস্তায় কিছু দূর যাওয়ার পর সন্দেহটা আবার মাথা তুলল। তাঁর স্পষ্ট মনে আছে, তালা লাগিয়েছেন। নিজের চোখে দেখেছেন, হাত দিয়ে টেনেও দেখেছেন। তারপরও মনের ভেতর অস্বস্তি কাটছে না। শেষ পর্যন্ত অফিসে পৌঁছানোর আগেই তাঁকে বাড়ি ফিরতে হলো।
বাইরে থেকে ঘটনাটি দেখে কেউ হয়তো বলবেন, মানুষটি বড্ড ভুলোমনা। কেউ বিরক্ত হয়ে বলবেন, একবার তালা দিলে বারবার ফিরে আসার কী আছে?
কিন্তু মানুষটি যদি তালা দেওয়ার কথা ভুলেই না গিয়ে থাকেন? যদি তাঁর সমস্যা ভুলে যাওয়া নয়, বরং সবকিছু ঠিক থাকার পরও নিশ্চিত হতে না পারা হয়?
এই জায়গাটুকু না বুঝলে তাঁর আচরণকে নিছক খেয়াল বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় দরজা বন্ধ হয়েছে কি না, গ্যাসের চুলা নেভানো হয়েছে কি না, তা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করি। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু পরীক্ষা করার পরও যদি সন্দেহ না কাটে, একই কাজ বারবার করতে হয়, আর সেই কারণে কর্মস্থলে দেরি হয় কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তখন বিষয়টি অন্যভাবে দেখা দরকার।
মনোরোগ চিকিৎসকেরা এ ধরনের পুনরাবৃত্ত চিন্তা ও তা থেকে তৈরি হওয়া বাধ্যতামূলক আচরণের সমস্যাকে অনেক সময় অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওসিডি বলে থাকেন। কারও মনে বারবার অনিচ্ছাকৃত সন্দেহ আসে, কারও মনে বিপদের আশঙ্কা ঘুরতে থাকে। সেই অস্বস্তি কমাতে কেউ দরজা পরীক্ষা করেন, কেউ বারবার হাত ধোন, কেউ আবার কোনো কাজ নির্দিষ্ট নিয়মে না করা পর্যন্ত স্বস্তি পান না।
তবে বারবার পরীক্ষা করলেই কারও ওসিডি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আসল বিষয় হলো, চিন্তা ও আচরণগুলো কতটা কষ্ট তৈরি করছে এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে কতটা বাধা দিচ্ছে।
এখানে একটা প্রশ্ন আসে—মানুষটি যখন জানেন যে তিনি তালা লাগিয়েছেন, তখনও কেন ফিরে যান?
কারণ, কোনো কিছু করা হয়েছে—এটা জানা আর তা নিয়ে মনে নিশ্চিন্ত বোধ করা এক বিষয় নয়। সন্দেহ জাগে, অস্বস্তি বাড়ে, আর সেই অস্বস্তি কমানোর জন্য মানুষটি আবার পরীক্ষা করেন। কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি আসে। তারপর নতুন প্রশ্ন: আগেরবার কি ঠিকমতো দেখেছিলাম?
এই স্বস্তিই একসময় সমস্যাটিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। মন শিখে ফেলে, সন্দেহ থেকে মুক্তি পেতে হলে আবার পরীক্ষা করতে হবে। ফলে যে কাজটি কয়েক সেকেন্ডে শেষ হওয়ার কথা, সেটিই একসময় দিনের অনেকটা সময় নিয়ে নেয়।
এর মধ্যে মানুষটির নিজের সঙ্গেও লড়াই চলে। তিনি হয়তো জানেন, এতবার পরীক্ষা করার দরকার নেই। নিজেকে থামানোর চেষ্টাও করেন। কিন্তু সন্দেহের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ বেড়ে গেলে সেই সিদ্ধান্ত ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের ওপর রাগ হয়, লজ্জা লাগে, কখনো মনে হয় নিজের মনকেই আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।
তারপর আসে আশপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়া।
পরিবারের কেউ বিরক্ত হয়ে বলতে পারেন, ‘কতবার বলব, তালা লাগানো আছে!’ কেউ হয়তো ঠাট্টা করে তাঁর আচরণের অনুকরণ করেন। আবার কেউ পরামর্শ দেন, ‘মন শক্ত করো, একবার যা করেছ, সেটা নিয়ে আর ভেবো না।’
কথাগুলো সব সময় খারাপ উদ্দেশ্যে বলা হয় না। অনেকেই ভাবেন, একটু বোঝালে কিংবা ধমক দিলে অভ্যাসটা চলে যাবে। কিন্তু মানুষটি যদি নিজের চেষ্টাতেই সমস্যাটি সামলাতে না পারেন, তাহলে তাঁকে দুর্বল বলে দোষারোপ করে লাভ কী? এতে তাঁর কষ্ট কমার বদলে তিনি হয়তো নিজের সমস্যার কথা বলা বন্ধ করে দেবেন।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়লেও পরিবার ও সমাজের একটি অংশ এখনো এসব সমস্যাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা কিংবা অযথা চিন্তা হিসেবে দেখে। শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সহজে মেনে নেওয়া হলেও মানসিক কষ্টের কথা উঠলে অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। পরিচিত মানুষ কী বলবে, পরিবারে কী প্রতিক্রিয়া হবে—এসব ভাবতে ভাবতে সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়।
এই দেরির মূল্য দিতে হয় সেই মানুষটিকেই। তাঁর সময় নষ্ট হয়, কাজে মন বসে না, সম্পর্কেও বিরক্তি জমে। কখনো পরিবারের সদস্যরা তাঁর আচরণে ক্লান্ত হয়ে পড়েন; অন্যদিকে তিনিও বুঝতে পারেন না, নিজের কষ্টের কথা কীভাবে বোঝাবেন।
সমাধানের শুরু হতে পারে সমস্যাটিকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কেউ যদি দেখেন, বারবার সন্দেহ ও পরীক্ষা করার কারণে তাঁর কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা ভালো। লক্ষণগুলো শুনে তাঁরা বুঝতে পারবেন, এটি ওসিডি কি না, নাকি অন্য কোনো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ওসিডির চিকিৎসায় এক ধরনের মনোচিকিৎসা বেশ কার্যকর হতে পারে, যার নাম এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন। সহজভাবে বললে, চিকিৎসকের সহায়তায় ব্যক্তি ধীরে ধীরে সন্দেহের মুখোমুখি হতে শেখেন, কিন্তু প্রতিবার সেই সন্দেহ দূর করতে আগের মতো একই কাজ করেন না।
ধরা যাক, একজন মানুষ তালা দেওয়ার পর বারবার ফিরে যান। চিকিৎসকের সঙ্গে পরিকল্পনা করে তিনি হয়তো প্রথমে তালা পরীক্ষা করার পর অল্প সময় অপেক্ষা করার অনুশীলন করবেন, তারপর ধীরে ধীরে ফিরে গিয়ে পরীক্ষা করার তাগিদ সামলাতে শিখবেন। এই অনুশীলন ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী ঠিক করা হয়; সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
কিছু ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ওষুধের পরামর্শও দিতে পারেন। কোন চিকিৎসা উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির লক্ষণ ও পরিস্থিতির ওপর। তাই নিজের ধারণায় রোগ নির্ণয় করা কিংবা অন্যের আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে পেশাদার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
পরিবারও সাহায্য করতে পারে। প্রথমেই দরকার ধৈর্য ধরে শোনা। ‘এত চিন্তা করো কেন?’ না বলে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, ‘এই চিন্তাটা তোমাকে কতটা কষ্ট দিচ্ছে?’ তাঁর কষ্টকে স্বীকার করা জরুরি। একই সঙ্গে বারবার আশ্বাস দিয়ে বা প্রতিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সাহায্য করে সমস্যার চক্রটিকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও সচেতন থাকা দরকার। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ পরিবারকে সঠিকভাবে সহায়তা করতে সাহায্য করতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতাও লিখে রাখা যেতে পারে—কোন সময় সন্দেহ বাড়ে, কী করলে বারবার পরীক্ষা করার তাগিদ আসে, আর এতে কতটা সময় চলে যায়। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সময় এই তথ্য কাজে লাগতে পারে। নিয়মিত ঘুম, বিশ্রাম ও দৈনন্দিন রুটিন মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হলেও এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, উন্নতি হতে সময় লাগতে পারে। কোনো দিন সন্দেহ সামলানো সহজ হবে, কোনো দিন আবার পুরোনো তাগিদ ফিরে আসবে। তাতে চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছে, এমন নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
দরজায় তালা দেওয়া মানুষটির দিকে আমরা তাকিয়ে দেখি, তিনি বারবার ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবার ফিরে যাওয়ার আগে তাঁর ভেতরে কী ঘটে, তা দেখি না। হয়তো তিনি নিজেও ক্লান্ত। হয়তো আর ফিরে যেতে চান না। তবু মনের ভেতর যে সন্দেহ তাঁকে আবার সেই দরজার সামনে দাঁড় করায়, সেটি সহজে থামে না।
তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করা সহজ। ধমক দেওয়াও সহজ। কঠিন হলো তাঁর আচরণের পেছনের কষ্টটুকু বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার পথ দেখানো।
দরজার তালা ঠিক আছে কি না, তা চোখে দেখা যায়। কিন্তু মনের ভেতরের সন্দেহ মানুষটিকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—সেটি কি আমরা কখনো বোঝার চেষ্টা করি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।