পরে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গতকাল রাতে এক পরিচিত মানুষকে ফোন করেছিলাম। কথা বলতে বলতে তিনি বললেন, “এখন একটু ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।”
“পরে”—কী আশ্চর্য একটি শব্দ!
এই একটি শব্দের মধ্যে আমরা জীবনের কত কিছু রেখে দিই। পরে করব। পরে যাব। পরে ফোন দেব। পরে দেখা হবে। পরে একটু নিজের জন্য বাঁচব।
কিন্তু সেই “পরে” কোথায় থাকে?
ক্যালেন্ডারে তার কোনো তারিখ নেই। ঘড়িতে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। তবু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আমরা সেখানেই জমা করে রাখি।
মায়ের সঙ্গে অনেক দিন বসা হয়নি। পরে বসব। পুরোনো বন্ধুটাকে ফোন করা দরকার। পরে করব। ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। পরে যাব। যে বইটা লিখতে চাই, শুরু করা হয়নি। সময় পেলে লিখব।
একটা শিশু বাবাকে বলে, “বাবা, আজ একটু বাইরে যাবে?”
বাবা হয়তো বলেন, “আজ না। শুক্রবার যাব।”
শুক্রবার আসে। অন্য কাজ এসে দাঁড়ায়। পরের শুক্রবার আসে। আবার অন্য কিছু।
এক শুক্রবার আরেক শুক্রবারকে সরিয়ে দেয়।
বছর যায়।
শিশুটিও একদিন বড় হয়ে যায়। তখন বাবার হাতে হয়তো আগের চেয়ে বেশি সময়। কিন্তু সেই শিশুটির কাছে বাবার জন্য আগের মতো সময় থাকে না।
আমাদের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। জরুরি জিনিসের জন্য আমরা সময় বের করি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের জন্য সময় রাখি না।
যে মানুষটি চলে গেলে তাকে আর পাওয়া যাবে না, তাকে আমরা সময় দিই না। আর যে কাজটি আগামীকালও করা যাবে, সেটার জন্য আজকের পুরো দিন দিয়ে দিই।
তবে সব “পরে” অলসতা থেকে আসে না।
আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে অনেক সময় “পরে” আসে অনিশ্চয়তা থেকে।
সকালে অফিস, রাস্তায় দীর্ঘ যানজট, সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরা। তারপর সন্তানের পড়াশোনা, বাজার, বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি, বাবা-মায়ের ওষুধ। মাসের শেষ দিকে নিজের ইচ্ছাগুলো তালিকার একেবারে নিচে চলে যায়।
কেউ হয়তো বহুদিন ধরে কোথাও বেড়াতে যেতে চান। কিন্তু নিজেকেই বলেন, “এখন না। পরিস্থিতি একটু ভালো হলে যাব।”
পরিস্থিতি ভালো হয় না।
অথবা খুব অল্প অল্প করে ভালো হয়, আবার অন্য কোনো খরচ এসে সেই জায়গাটা নিয়ে নেয়।
এভাবেই অনেক স্বপ্নের বয়স বাড়ে, কিন্তু স্বপ্নগুলো আর বাস্তব হয় না।
আমরা ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে গিয়ে বর্তমানটাকেই বন্ধক রাখি।
অবশ্যই ভবিষ্যতের জন্য ভাবতে হবে। টাকা জমাতে হবে। সন্তানের পড়াশোনা, সংসার, চিকিৎসা, বৃদ্ধ বয়স—সবকিছুর হিসাব আছে। দায়িত্ব এড়িয়ে শুধু আনন্দের পেছনে ছুটে চলাও কোনো সমাধান নয়।
সমস্যা তখনই, যখন ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিতে নিতে বর্তমানটাকে বাঁচার মতো কিছুই রাখা হয় না।
অবসর নিলে ঘুরব। সময় পেলে লিখব। টাকা হলে মাকে নিয়ে যাব। কাজ কমলে স্ত্রীর সঙ্গে বসে কথা বলব। সন্তান একটু বড় হলে তার সঙ্গে সময় কাটাব।
কিন্তু জীবন সবসময় আমাদের পরিকল্পনার জন্য অপেক্ষা করে না।
অবসরের আগেই শরীর খারাপ হতে পারে। টাকা জমার আগেই কোনো মানুষ চলে যেতে পারে। সন্তান বড় হয়ে নিজের শহরে চলে যেতে পারে। যে সম্পর্কটাকে “সময় হলে ঠিক করে নেব” বলে ফেলে রেখেছিলাম, সেটি তত দিনে নীরব হয়ে যেতে পারে।
মৃত্যুর কথা আমরা সাধারণত ভয় পাওয়ার জন্য মনে করি। অথচ মৃত্যুর কথা মনে রাখা দরকার সময়ের মূল্য বোঝার জন্য।
একদিন হয়তো ফিরে তাকিয়ে মনে হবে, মায়ের সঙ্গে আরেকটু বসা যেত। বন্ধুটাকে আরেকবার ফোন করা যেত। সন্তান যখন ডাকছিল, তখন মোবাইলটা নামিয়ে রাখা যেত। কাছের মানুষটাকে বলা যেত, “ভালোবাসি।”
কথাগুলো কঠিন ছিল না। সময়টাও হয়তো খুব বেশি লাগত না।
তবু আমরা বলিনি।
কারণ ভেবেছিলাম, পরে বলব।
“পরে” আসলে ভবিষ্যতের আরেকটি নাম নয়। অনেক সময় এটি আমাদের নিজের কাছে দেওয়া সবচেয়ে সহজ অজুহাত।
আজ যে ফোনটা করিনি, কাল করব। আজ যে ক্ষমাটা চাইনি, কাল চাইব। আজ যে কথাটা বলিনি, সুযোগ হলে বলব।
কিন্তু সুযোগ সবসময় দ্বিতীয়বার আসে না।
তাই জীবনের সব কাজ একসঙ্গে শেষ করার দরকার নেই। সব স্বপ্ন আজই পূরণ করারও দরকার নেই। শুধু কিছু জিনিস আছে, যেগুলোকে “পরে”র তালিকায় রাখা ঠিক নয়।
মায়ের সঙ্গে পাঁচ মিনিট বসা। পুরোনো বন্ধুকে ফোন করা। সন্তানের পাশে চুপচাপ বসে থাকা। ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া। ভালোবাসার মানুষটির দিকে একটু মন দিয়ে তাকানো। যে বইটা লিখতে চান, তার প্রথম পাতাটা খুলে বসা।
এসবের জন্য পৃথিবী থামিয়ে দিতে হয় না।
শুধু নিজের ব্যস্ত জীবনের মধ্যে একটু জায়গা করে দিতে হয়।
“পরে” হয়তো আসবে।
কিন্তু সব “পরে” যে আসে না, তার প্রমাণ আমাদের চারপাশেই আছে।
শুধু আমরা দেখতে চাই না।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল এটাই—আমরা ভাবি, সময় আমাদের হাতে আছে।
আসলে আমরা সময়ের হাতে আছি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।