লিলিথের প্রশ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩১ অক্টোবর ২০২৬
একটি মেয়ে একজন প্রবীণকে প্রশ্ন করল, “সত্যিই কি হযরত আদম (আ.)-এর আগে আরেকজন নারী ছিলেন, তাঁর নাম লিলিথ?”
প্রবীণ বললেন, “লিলিথের কাহিনি ইহুদি লোককথা ও পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্য থেকে এসেছে। মধ্যযুগের ‘আলফাবেট অব বেন সিরা’ নামের একটি রচনায় তাঁকে আদমের প্রথম স্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেই কাহিনিতে বলা হয়, আদমের মতো একই উপাদান থেকে সৃষ্টি হওয়ায় লিলিথ নিজেকে তাঁর সমান মনে করতেন। অধীনতা মেনে না নিয়ে তিনি আদমকে ছেড়ে চলে যান। তবে এটি সৃষ্টির স্বীকৃত ইতিহাস নয়। কোরআন বা হাদিসে এমন কোনো কাহিনি নেই। বাইবেলের পুরোনো নিয়মে ‘লিলিথ’ শব্দটির উল্লেখ থাকলেও সেখানে আদমের প্রথম স্ত্রী হিসেবে তাঁর কোনো পরিচয় দেওয়া হয়নি।”
মেয়েটি আবার জানতে চাইল, “তাহলে এই গল্পের শিক্ষা কী? প্রথম নারী কে ছিলেন, সেই প্রশ্নের চেয়েও কি একজন নারীর সমান মর্যাদা চাওয়ার প্রশ্নটি বড়?”
প্রবীণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “হয়তো আজও আমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বাকি।”
লিলিথের কাহিনি সত্য কি না, সেটি এক প্রশ্ন। কিন্তু কাহিনিটি এত দিন ধরে মানুষের আগ্রহ ধরে রেখেছে কেন, সেটি আরেক প্রশ্ন। এর মধ্যে এমন একটি বিষয় আছে, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতির গণ্ডিতে আটকে নেই। সেটি হলো, নারী কি পুরুষের সমান মর্যাদা পাবে, নাকি তাকে সব সময় কারও অধীন হয়ে থাকতে হবে?
লিলিথের গল্পে সমতার বিষয়টি এসেছে পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। কাহিনির ভাষ্য অনুযায়ী, লিলিথ আদমের অধীন হতে চাননি। তাই তিনি চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে কেউ তাঁকে বিদ্রোহী নারী, কেউ স্বাধীনতার প্রতীক, আবার কেউ অশুভ শক্তির প্রতিরূপ হিসেবে দেখেছে। একই চরিত্রের এমন ভিন্ন ব্যাখ্যা আমাদের ভাবায়। একজন নারী নিজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললে সমাজ তাকে কী চোখে দেখে?
বাস্তব জীবনে এই প্রশ্নের উত্তর খুব একটা বদলায়নি। মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়, কিন্তু পরিবার বলে, এত দূরে গিয়ে পড়ার দরকার কী? চাকরি করে সংসারে অর্থ দেয়, অথচ নিজের উপার্জনের টাকা কোথায় খরচ হবে, সেই সিদ্ধান্তও সব সময় তার হাতে থাকে না। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে কোন শহরে থাকবে, চাকরি চালিয়ে যাবে কি না, এমনকি সন্তান নেওয়ার সময় নিয়েও তার মতামত উপেক্ষিত হয়। অথচ একই সিদ্ধান্তে একজন পুরুষের মতামতকে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নারী-পুরুষের সমতা মানে দুজনের জীবন, দায়িত্ব কিংবা অভিজ্ঞতা এক রকম হওয়া নয়। সমতা মানে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা, নিজের জীবন সম্পর্কে মত প্রকাশের অধিকার, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা। সংসারে দায়িত্ব ভাগ হবে, সিদ্ধান্তেও দুজনের অংশ থাকবে। একজনের মতামত ছোট হয়ে যাবে না, শুধু তিনি নারী বলে।
ধর্মের নামেও কখনো কখনো নারীর অধিকার সংকুচিত করা হয়। আবার ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরেও পুরুষতান্ত্রিক আচরণ টিকে থাকে। তাই সব সমস্যার দায় ধর্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি ধর্মের দোহাই দিয়ে বৈষম্যকে ন্যায্য বলাও গ্রহণযোগ্য নয়।
লিলিথ ইতিহাসের প্রথম নারী ছিলেন কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। কিন্তু তাঁর কাহিনি যে প্রশ্নটি সামনে আনে, সেটি আজও জীবন্ত। ঘরের মেয়েটি যখন নিজের পছন্দে পড়াশোনা করতে চায়, কর্মক্ষেত্রে সমান পারিশ্রমিক দাবি করে, কিংবা স্ত্রী যখন সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজের মত জানায়, তখন সেই পুরোনো প্রশ্নটিই ফিরে আসে।
নারীকে সমান মর্যাদা দেওয়া কি সত্যিই এত কঠিন?
হয়তো লিলিথের গল্পের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণে নয়, বরং সেই প্রশ্নে, যার উত্তর আজও আমাদের সমাজ পুরোপুরি দিতে পারেনি।
তথ্যসূত্র
১. আলফাবেট অব বেন সিরা, ২৩ক-খ।
২. বাইবেল, ইশাইয়া ৩৪:১৪।
৩. Wojciech Kosior, “A Tale of Two Sisters”, Nashim, ২০১৮।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।