পারিবারিক কলহে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ
তারিখঃ ১৪ অক্টোবর ২০২৫
মানুষ জন্ম থেকেই সম্পর্কের আবরণে জড়ানো। পরিবার সেই সম্পর্কের প্রথম ও সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ক্ষেত্র। সেখানে ভালোবাসা, যত্ন ও পারস্পরিক সম্মানই একটি শিশুর মানসিক গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু যখন সেই পরিবারেই প্রতিদিন বিরোধ, মনোমালিন্য বা শীতল সম্পর্কের হাওয়া বইতে থাকে, তখন শিশুর শৈশব হারিয়ে যায় এক অদৃশ্য আতঙ্কে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন—“শিশু শব্দের চেয়ে অনুভূতি দ্রুত শেখে।”
অর্থাৎ বাবা-মায়ের আচরণ, স্বর, মুখভঙ্গি, এমনকি নীরবতাও তার মনে গভীর ছাপ ফেলে।
একটি শিশুর মানসিক বিকাশ শুরু হয় নিরাপত্তা থেকে—আর পারিবারিক কলহ সেই নিরাপত্তার মূলে আঘাত হানে।
যখন শিশুর আশপাশে ক্রমাগত ঝগড়া, চিৎকার বা উপহাসের শব্দ শোনা যায়, তখন তার মনে ভয়, অপরাধবোধ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
American Psychological Association (APA)–এর গবেষণায় (২০২১) দেখা গেছে—
পিতামাতার তর্ক বা চিৎকারে শিশুর কর্টিসল হরমোন (স্ট্রেস হরমোন) বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, রাগ ও শেখার ক্ষমতা হ্রাস ঘটায়।
শিশু যদি প্রতিদিন দেখে বাবা-মা পরস্পরকে অবমাননা করছে, তার মনে ধীরে ধীরে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়।
সে ভাবতে শেখে—ভালোবাসার মানে কি শুধু ঝগড়া ও কষ্ট?
এভাবেই ক্ষয়ে যেতে থাকে তার আবেগী জগৎ।
বাংলাদেশে BRAC Institute of Governance and Development (BIGD)–এর এক জরিপ (২০২২) অনুযায়ী, পারিবারিক অস্থিরতায় বড় হওয়া শিশুদের মধ্যে ৬৭% এর বেশি আচরণগত সমস্যা দেখা যায়—আগ্রাসন, নীরবতা বা একাকিত্ব।
সব কলহ চিৎকারে প্রকাশ পায় না। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা মাসের পর মাস একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন না।
বাইরে থেকে পরিবারটি শান্ত মনে হলেও ঘরের ভেতর থাকে এক অদ্ভুত শীতলতা—
যা শিশুর মনে আরও গভীর প্রভাব ফেলে।
এই নীরবতা শিশুর মস্তিষ্কে “emotional neglect” হিসেবে নিবন্ধিত হয়।
Harvard Center on the Developing Child–এর গবেষণা (২০২0) দেখায়, যেসব শিশুরা মানসিক অবহেলার পরিবেশে বড় হয়, তাদের মস্তিষ্কের ‘amygdala’ অংশ (ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চল) বিকৃত আকার ধারণ করে। ফল—অল্পতেই ভয় পাওয়া, হঠাৎ রাগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা।
যে শিশু পরিবারে প্রতিদিন সংঘাত দেখে বড় হয়, তার মস্তিষ্কে সেই আচরণ স্বাভাবিক হিসেবে গেঁথে যায়।
মনোবিজ্ঞানী Bandura-র “Social Learning Theory” অনুযায়ী—মানুষ যা দেখে, তা-ই শেখে।
তাই এই শিশুরা পরবর্তীতে নিজেদের সম্পর্কেও একই ধরণের সহিংস বা অবমাননাকর আচরণে জড়িয়ে পড়ে।
একটি গবেষণা (UNICEF, State of the World’s Children 2023) জানায়—যেসব শিশু পিতামাতার সংঘাতের পরিবেশে বড় হয়, তাদের ৬০% প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে সম্পর্কের স্থিতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।
অর্থাৎ, কলহ শুধু এক প্রজন্ম নয়—পুরো সমাজে এক নীরব সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি করে।
আমাদের দেশে সামাজিক চাপ, আর্থিক অস্থিরতা, পারিবারিক কর্তৃত্ববোধ ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কলহের মূল উৎস।
বেশিরভাগ পরিবারেই সমস্যা শুরু হয় ছোট বিষয় থেকে—
কিন্তু “আমি কেন ছাড়ব?” এই অহংকারই তা পরিণত করে স্থায়ী সংঘাতে।
শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে এখন “silent breakdown” বাড়ছে—বাবা-মা একসঙ্গে থাকলেও আবেগিক দূরত্ব বাড়ছে।
একটি সমীক্ষা (The Daily Star, ২০২৪) অনুযায়ী, ঢাকার ৪২% পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে “emotional disconnection” দেখা যায়, যা সন্তানের স্কুল পারফরম্যান্স ও আত্মমর্যাদায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, বাবা-মাকে বুঝতে হবে—সংঘাত নয়, সহযোগিতাই শিশুর নিরাপত্তার ভিত্তি।
বাচ্চার সামনে কখনো উচ্চস্বরে তর্ক বা অপমানজনক কথা বলা উচিত নয়। মতভেদ হলে সেটি ব্যক্তিগতভাবে বা নিরপেক্ষ পরামর্শকের সহায়তায় মেটানো উচিত।
দ্বিতীয়ত, emotional literacy বাড়ানো প্রয়োজন—অর্থাৎ, রাগ বা হতাশা প্রকাশের গঠনমূলক ভাষা শেখা। “তুমি ভুল” না বলে “আমি কষ্ট পেয়েছি”—এই রকম অভিব্যক্তি সম্পর্কের গঠন বদলায়।
তৃতীয়ত, বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্মান ও ছোট ছোট স্নেহের ইঙ্গিত (একসঙ্গে খাওয়া, শিশুর সামনে হাসি বিনিময়, একে অপরের ভালো দিক বলা) শিশুর মনে নিরাপত্তা তৈরি করে।
চতুর্থত, প্রয়োজনে পরিবার পরামর্শ কেন্দ্র বা কাউন্সেলিং সেবা নেওয়া—যেমন Moner Bondhu, Mind Aid, বা সরকারি Family Welfare Centre—এসব সেবায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়া যায়।
শিশু শুধু সমাজের ভবিষ্যৎ নয়, সে পরিবারের প্রতিচ্ছবি।
যে পরিবার ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার ভিতের ওপর দাঁড়ায়, তার সন্তানরাই ভবিষ্যতে স্থিতিশীল, নৈতিক ও মানবিক সমাজ তৈরি করতে পারে।
তাই, বাবা-মায়ের প্রতিটি আচরণই এক ধরনের বিনিয়োগ—ভালোবাসা দিলে ভালোবাসা ফেরে, সংঘাত দিলে ভয়ের চক্র জন্ম নেয়।
মনে রাখতে হবে, শান্ত পরিবার মানেই নিরাপদ সমাজ।
আর সমাজের শান্তি শুরু হয় সেই ছোট্ট ঘর থেকে, যেখানে এক শিশু প্রথম শিখে—ভালোবাসা মানে কী।
তথ্যসূত্রঃ
American Psychological Association (APA), Impact of Parental Conflict on Child Development, 2021
Harvard Center on the Developing Child, Effects of Early Emotional Neglect, 2020
UNICEF, State of the World’s Children 2023: For Every Child, Every Right
BRAC Institute of Governance and Development (BIGD), Family Dynamics and Child Mental Health in Bangladesh, 2022
The Daily Star, Silent Emotional Breakdown in Urban Families, 2024
#শিশুমন #মানসিকস্বাস্থ্য #পরিবার #পারিবারিককলহ #মনোবিজ্ঞান
#Parenting #ChildDevelopment #PeacefulParenting #EmotionalHealth
#MohammadZahidHossain #বাংলাপ্রবন্ধ #HumanDevelopment
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।