মুখোশের যুগে মানুষ খোঁজা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
১৩ জুলাই, ২০২৬
একসময় মানুষ চিনতে সময় লাগত। দু-চার দিনে নয়, অনেকটা পথ একসঙ্গে হাঁটার পর বোঝা যেত— মানুষটা আসলে কেমন। কে কী বলছে, তার চেয়ে কে কী করছে, সেটাই ছিল আসল মাপকাঠি। এখন হিসাবটা উল্টে গেছে। কাউকে সামনে না দেখেও আমরা তার ফেসবুক প্রোফাইল দেখে একটা ধারণা গড়ে ফেলি। পরিপাটি ছবি, গুছিয়ে লেখা কয়েকটা স্ট্যাটাস, দু-একটা মন ছুঁয়ে যাওয়া লাইন— ব্যস, মনে হয় মানুষটাকে চিনে ফেলেছি। পরে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে দেখি, পর্দার মানুষ আর রক্ত-মাংসের মানুষ এক নয়।
আজকাল একটা প্রবণতা খুব চোখে পড়ে। মানুষ কেমন, সেটা আর মুখ্য নয়। মানুষকে কেমন দেখানো যাচ্ছে, সেটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অনেকে নিজের জীবন গোছানোর চেয়ে নিজের ইমেজ গোছাতে বেশি ব্যস্ত।
সামাজিক ভণ্ডামি যে আগে ছিল না, তা নয়। তবে এখন সেটা আরও প্রকট। কারণ এখন সবার হাতে একটা করে মঞ্চ— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সেখানে কেউ মানবতা, সততা, ন্যায়বিচার নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখে যাচ্ছেন। অথচ বাস্তবে হয়তো অধীনস্থ কাউকে অপমান করছেন, ঘরে মানুষের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করছেন, কিংবা নিজের সুবিধার জন্য অন্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন।
সমস্যাটা এখানেই।
আমরা ধীরে ধীরে কাজের চেয়ে কথাকে বড় করে দেখতে শিখেছি।
সবচেয়ে অবাক লাগে যখন দেখি, অনেকে এই দ্বৈত জীবনকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছেন। অনলাইনে এক রূপ, অফলাইনে আরেক রূপ— যেন এটাই নিয়ম। অথচ মানুষ আসলে কে, সেটা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় না। বোঝা যায় ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার পর সে কীভাবে অন্যের সঙ্গে আচরণ করে।
ভালো কাজের ছবি কেউ শেয়ার করতেই পারেন, তাতে দোষ নেই। কিন্তু যখন ছবি তোলাটাই মুখ্য হয়ে ওঠে, তখনই বিপদ। তখন সাহায্যের চেয়ে প্রচার বড় হয়ে দাঁড়ায়। সহানুভূতিও কনটেন্ট হয়ে যায়। অন্যের কষ্ট তখন লাইক আর শেয়ারের উপাদানে পরিণত হয়।
আমরা প্রায়ই বলি, “লোকটা খুব ভদ্র।” কিন্তু ভদ্রতা বলতে আসলে কী বোঝাই?
ভদ্রতা কেবল পরিপাটি পোশাক বা মাপা ভাষা নয়। সত্যিকারের ভদ্রতা দেখা যায় তখন, যখন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কাউকে অপমান করে না। যখন দুর্বল মানুষের সঙ্গেও একই সম্মানে কথা বলে। যখন কোনো লাভ না থাকলেও দেওয়া কথা রাখে। আর যখন সম্মানটা কেবল বড়লোক বা প্রভাবশালীদের জন্য নয়— সবার জন্য সমান থাকে।
অনেককে দেখেছি, অফিসে বসের সামনে ভীষণ বিনয়ী। অথচ ঘরে ফিরে স্ত্রী, সন্তান কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তারা মানুষই নয়। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে নীতিকথা লেখেন, কিন্তু সামান্য সমালোচনাতেই রেগে আগুন হয়ে যান। তখন বুঝতে বাকি থাকে না— শিক্ষিত হওয়া আর চরিত্রবান হওয়া এক কথা নয়।
আরেকটা বিষয় এখন বাড়ছে। আমরা মানুষের চরিত্রের চেয়ে তার ব্র্যান্ডিংকে বেশি দাম দিই। কেউ সুন্দর করে কথা বলতে পারে, ভালো ভিডিও বানাতে পারে, নিজের একটা আকর্ষণীয় ইমেজ দাঁড় করাতে পারে— তাহলেই তাকে ভালো মানুষ ভেবে নিই। মানুষকে যাচাই করতে যে সময় আর ধৈর্য লাগে, সেটা আমাদের আর নেই।
তার ফলও আমরা পাচ্ছি। বিশ্বাস ভাঙছে, সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, প্রতারণা বাড়ছে। কারণ আমরা মানুষকে তার কাজ দিয়ে নয়, তার বানানো ছবি দিয়ে বিচার করতে শিখে গেছি।
তবু সব শেষ হয়ে যায়নি।
আজও এমন মানুষ আছেন, যারা নীরবে ভালো কাজ করে যান। কাউকে সাহায্য করেন, কিন্তু ছবি তোলেন না। সম্মান করেন, কারণ সেটা তাদের স্বভাব— দেখানোর জন্য নয়। তারা হয়তো আলোচনায় থাকেন না, কিন্তু সমাজটা এখনো তাদের মতো মানুষের জন্যই টিকে আছে।
আমার মনে হয়, আমাদের আবার সহজ জায়গাটায় ফিরে যাওয়া দরকার। ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টাটা অনেক জরুরি। মুখোশ বেশিদিন টেকে না। কোনো না কোনো সময় সেটা খসে পড়ে। তখন পড়ে থাকে কেবল মানুষের চরিত্র।
সমাজ বদলাতে বড় বড় বক্তৃতা সবসময় লাগে না। লাগে নিজের ভেতরের মানুষটাকে একটু বদলানো। অনলাইনে যেমন, অফলাইনেও তেমন থাকা। কেউ দেখুক বা না দেখুক, মানুষকে সম্মান করা। কারণ দিনের শেষে ভদ্রতা কথায় নয়, আচরণেই ধরা পড়ে।
আপনি কি কখনো কারও মুখোশ খুলে যেতে দেখেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, জানাতে পারেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।