পদচিহ্ন
(জীবন, সাফল্য ও মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা |
২৩ অক্টোবর ২০২৬
বললাম, “সফলতার পথে পদচিহ্ন দেখি না কেন?”
সে উত্তর দিল, “অতি অল্প লোকই তো অগ্রসর হয়ে থাকে।”
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। চারপাশে কত মানুষকে দেখি সফল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে। কেউ বড় কিছু করতে চায়, কেউ লেখক হতে চায়, কেউ নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে চায়। অথচ স্বপ্নের কথা যত সহজে বলা যায়, সেই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া তত সহজ নয়।
জিজ্ঞেস করলাম, “এত মানুষ যখন সফল হতে চায়, তখন এগিয়ে যায় না কেন?”
সে একটু ভেবে বলল, “জানি না, সবার ক্ষেত্রে একই কারণ কি না। তবে চাওয়া আর চেষ্টা করে যাওয়ার মধ্যে যে একটা ফারাক আছে, সেটা বুঝেছি। স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু সেই স্বপ্নের জন্য প্রতিদিন কাজ করা, ব্যর্থ হলে আবার শুরু করা—এসব আর অতটা ভালো লাগে না।”
আমি বললাম, “তাহলে যারা সফল হয়নি, তারা কি যথেষ্ট চেষ্টা করেনি?”
সে মাথা নাড়ল।
“না, এভাবে বলা ঠিক হবে না। কারও যোগ্যতা আছে, কিন্তু সুযোগ নেই। কেউ পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের স্বপ্নের জন্য সময় পায় না। কেউ অর্থকষ্টে আটকে যায়। আমি একসময় ভাবতাম, মন থেকে চাইলে মানুষ সব পারে। এখন আর এত সহজ করে ভাবতে পারি না।”
তার কথায় এবার একটু থমকে গেলাম।
আমরা প্রায়ই সফল মানুষের শেষ ছবিটা দেখি। তার প্রতিষ্ঠিত অবস্থান, পরিচিতি কিংবা অর্জনের গল্প নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে কতটা পথ পেরোতে হয়েছে, কতবার ব্যর্থ হতে হয়েছে, সেসব খোঁজ রাখি না।
একজন লেখকের বই প্রকাশিত হলে আমরা তার নাম মনে রাখি। পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘোরার দিনগুলো মনে রাখি না। বইটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আগেই হয়তো লেখককে অনেকবার নিজের লেখার মান নিয়ে সন্দেহ করতে হয়েছে। তবু তিনি লিখেছেন, সংশোধন করেছেন, আবার পাঠিয়েছেন।
আমরা বইটা হাতে পাই। তার আগের দীর্ঘ অপেক্ষাটা পাই না।
বললাম, “তাহলে কি সাহস থাকলেই সফল হওয়া যায়?”
সে একটু হেসে বলল, “আমিও একসময় তাই ভাবতাম। এখন মনে হয়, সাহস থাকলেই সব হয় না। চেষ্টা করেও মানুষ ব্যর্থ হয়। আমিও হয়েছি।”
আমি তার দিকে তাকালাম। এতক্ষণ যে মানুষটাকে সব প্রশ্নের উত্তর জানা একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল, এবার তাকে অন্য রকম লাগল।
সে আবার বলল, “তবে ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে শুরুই না করলে কী হবে, সেটাও তো ভেবে দেখা দরকার। সব সময় জিততে হবে, এমন নয়। কখনো বুঝতে হয় কোথায় ভুল হচ্ছে, কখনো নতুন করে শিখতে হয়। আর কখনো মেনে নিতে হয়, চেষ্টা করেও সবকিছু পাওয়া যায় না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ কী?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “হয়তো নিজের জায়গা থেকে একটু সামনে যাওয়া। অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নয়। গতকাল যে কাজটা ভয়ে শুরু করতে পারিনি, আজ সেটা শুরু করতে পারাও তো এগোনো।”
কথাটা শুনে নিজের কথা মনে পড়ল। কত কাজ শুরু করার আগে ভেবেছি, আরেকটু প্রস্তুতি নিই। পরিস্থিতি ভালো হোক, আত্মবিশ্বাস বাড়ুক, তারপর শুরু করব। এভাবে অপেক্ষা করতে করতে কখনো কখনো কাজটার চেয়ে অপেক্ষাটাই বড় হয়ে উঠেছে।
আমরা অনেকেই এমন করি। ব্যর্থতার আশঙ্কায় শুরু করতে চাই না, অথচ শুরু না করার কারণে কী হারাচ্ছি, তার হিসাবও রাখি না।
অবশ্য সবার পথ এক নয়। কারও সামনে বাধা কম, কারও সামনে অনেক বেশি। কেউ অল্প বয়সে সুযোগ পায়, কেউ বহু বছর চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। তাই কারও পদচিহ্ন কম বলে তার চেষ্টা কম ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তবু নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কোনো একসময় কল্পনা থেকে কাজে নামতেই হয়। শুধু সফল মানুষের গল্প পড়ে, তাদের অভিজ্ঞতা শুনে কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।
শেষবার জিজ্ঞেস করলাম, “পথে যদি কেউ না থাকে, তবে একা হাঁটব কীভাবে?”
সে এবার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সামনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “ভয় তো আমারও লাগে। তবে সবাই আগে হেঁটে যাবে, তারপর আমি হাঁটব—এমন ভাবলে হয়তো কোনো দিনই শুরু করা হবে না।”
কথাটা মনে নিয়ে সামনের দিকে তাকালাম। পথটা তখনও ফাঁকা। দূরে একটা আলো দেখা যাচ্ছিল।
আমি এক পা এগিয়ে দিলাম।
পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, মাটিতে একটি নতুন দাগ পড়েছে।
পথে পদচিহ্ন কম বলে পথ থেমে থাকে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।