ইতিহাস থেকে যে ধর্মের অর্ধেক হারিয়ে গেছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো—আমরা যা জানি, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু হয়তো একসময় ছিল, কিন্তু এখন আর নেই।
কোনো গ্রন্থ হারিয়ে গেছে। কোনো পুঁথি পুড়ে গেছে। কোনো ভাষা আর কেউ বোঝে না। আবার কোনো ঐতিহ্য লেখা হওয়ার আগেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মুখে মুখে ঘুরে হারিয়ে গেছে।
জরথুস্ত্রবাদের ইতিহাসে এমন একটি শূন্যতা খুব স্পষ্ট।
এই ধর্মের প্রাচীন পবিত্র গ্রন্থসমষ্টির নাম অবস্তা। এতে জরথুস্ত্রীয় ধর্মীয় চিন্তা, প্রার্থনা, আচার, আইন, পুরাণ এবং বিশ্বাসের নানা স্তরের উপাদান সংরক্ষিত আছে। কিন্তু আজকের এই পবিত্র গ্রন্থসমষ্টিকে প্রাচীন জরথুস্ত্রীয় ধর্মগ্রন্থের সম্পূর্ণ রূপ ভাবলে ভুল হবে।
কারণ আমরা পুরো বইটি হাতে পাইনি।
বরং পেয়েছি তার টিকে থাকা একটি অংশ।
এখানে গল্পটা আরও জটিল।
অবস্তার উপাদানগুলো একই সময়ে রচিত হয়নি। এর কিছু অংশ অত্যন্ত প্রাচীন, আবার কিছু অংশ পরবর্তী সময়ের। গবেষকদের মতে, বহু শতাব্দী ধরে এই ধর্মীয় ঐতিহ্য মৌখিকভাবে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছে। সাসানীয় যুগে এসে পুরোহিতেরা বিভিন্ন পুরোনো লিখিত ও মৌখিক ঐতিহ্য সংগ্রহ, সম্পাদনা এবং সংকলনের কাজ করেন।
অর্থাৎ আজ আমরা যে অবস্তা দেখি, সেটি একদিনে লেখা কোনো একক গ্রন্থ নয়।
এটি বহু শতাব্দীর ধর্মীয় স্মৃতি, আচার ও শিক্ষার সংকলন।
আর সেই সংকলনেরও সবটা আমাদের হাতে নেই।
সাসানীয় যুগে অবস্তার একটি বৃহৎ সংকলন ছিল বলে গবেষণায় ধারণা পাওয়া যায়। ঐতিহ্যগতভাবে এর সঙ্গে একুশটি নস্ক বা গ্রন্থাংশের কথা বলা হয়। পরবর্তী জরথুস্ত্রীয় গ্রন্থ দেনকার্দ-এ সেই বিশাল ধর্মগ্রন্থভাণ্ডারের বিষয়বস্তুর একটি বিবরণ পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের অবস্তায় সেই সম্পূর্ণ কাঠামো আর নেই।
হারিয়ে যাওয়া অংশের কিছু চিহ্ন অবশ্য একেবারে মুছে যায়নি।
পরবর্তী ধর্মীয় গ্রন্থে পুরোনো গ্রন্থের উদ্ধৃতি আছে। কোনো কোনো হারানো রচনার বিষয়বস্তুর সারাংশ পাওয়া যায়। আবার এমন কিছু অংশের উল্লেখ আছে, যেগুলোর মূল পাঠ আর আমাদের হাতে নেই।
এ যেন একটি ভেঙে যাওয়া বাড়ির দেয়াল দেখে বোঝার চেষ্টা করা—একসময় ঘরটি কেমন ছিল।
এই জায়গাটাই ইতিহাসকে কঠিন করে তোলে।
কারণ একটি ধর্মের ইতিহাস লিখতে গেলে আমরা সাধারণত তার টিকে থাকা গ্রন্থের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু টিকে থাকা গ্রন্থ সবসময় পুরো ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। কখনো কখনো যা বেঁচে গেছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যা হারিয়ে গেছে।
অবস্তার ক্ষেত্রেও এমন প্রশ্ন আছে।
কোন ধর্মীয় ধারণাগুলো হারিয়ে গেছে?
কোন পুরোনো কাহিনি আর আজ পড়া যায় না?
কোন আইন, আচার কিংবা বিশ্বাসের কথা আমরা শুধু পরবর্তী গ্রন্থের উল্লেখ থেকে অনুমান করতে পারি?
এসব প্রশ্নের সবগুলোর উত্তর আমাদের জানা নেই।
এমনকি প্রাচীন অবস্তার ঠিক কতটা অংশ হারিয়েছে, তারও নিশ্চিত হিসাব নেই। গবেষণায় বর্তমান অবস্তাকে সাসানীয় যুগের বৃহৎ সংকলনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এটিকে নির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত সংখ্যা হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। কতটা হারিয়েছে, তার সঠিক হিসাব ইতিহাস আমাদের দেয় না।
আর এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
হারিয়ে যাওয়া মানেই অজানা নয়।
কোনো গ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপি না থাকলেও তার উদ্ধৃতি, সারাংশ, অনুবাদ কিংবা পরবর্তী লেখকের উল্লেখ থেকে তার কিছু অংশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আবার উল্টো ঘটনাও ঘটে। কোনো প্রাচীন অংশ টিকে থাকলেও তার সময়, উদ্দেশ্য বা প্রাথমিক রূপ নিয়ে বিতর্ক থেকে যেতে পারে।
তাই ধর্মের ইতিহাস শুধু যা লেখা আছে তার ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিরও ইতিহাস।
জরথুস্ত্রবাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর প্রাচীন ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় মৌখিকভাবে সংরক্ষিত ছিল। লিখিত রূপ পাওয়ার আগেই বহু প্রজন্ম সেই ধর্মীয় জ্ঞান মুখে মুখে বহন করেছে।
কতটা বদলেছে, কতটা অপরিবর্তিত থেকেছে—সবকিছুর উত্তর আমাদের কাছে নেই।
তবু যা আছে, সেটুকুও অসাধারণ।
কারণ কয়েক হাজার বছরের ব্যবধান পেরিয়ে কিছু কণ্ঠ এখনো আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
আর যে কণ্ঠগুলো পৌঁছায়নি, তাদের অনুপস্থিতিও ইতিহাসের অংশ।
হয়তো কোনো ধর্মের সবচেয়ে বড় রহস্য তার সংরক্ষিত গ্রন্থে নয়।
কখনো কখনো রহস্যটা লুকিয়ে থাকে সেই পাতাগুলোতে, যেগুলো আমরা আর কোনোদিন পড়তে পারব না।
তথ্যসূত্র: Encyclopaedia Iranica — “Avesta”, “Dēnkard”; Mary Boyce — A History of Zoroastrianism.
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।