সাহিত্যে প্রান্তিক কণ্ঠ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | এপ্রিল ২৫, ২০২৬
(আমার “করুণার খাঁচায় বন্দি গরিব” প্রবন্ধের ধারাবাহিক আলোচনা। এখানে বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক চরিত্রের প্রতিনিধিত্বকে “করুণা বনাম অনুপস্থিতি” বাইনারি থেকে সরিয়ে “ন্যারেটিভ কন্ট্রোল ও এজেন্সি” ফ্রেমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। টেক্সটুয়াল রিডিং, তুলনামূলক কেস স্টাডি এবং লোকাল আর্কাইভ উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে।)
পদ্মা নদীর মাঝি পড়ার পর প্রথম মনে হয়েছিল—কুবের আমার মতোই রাগ করে, সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিরোধ করে।
কিন্তু পথের পাঁচালীর দুর্গাকে পড়ে মনে হয়েছিল—ও শুধু কাঁদে, আর পরিস্থিতি ওকে চালায়।
এই পার্থক্যটা শুধু দুই চরিত্রের না।
এটা একটা বড় প্রশ্ন তোলে—সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষ কি নিজের জীবনকে নিজের মতো করে চালায়, নাকি তারা শুধু ঘটনার ভেতর ঘটে যায়?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির কুবেরকে যদি দেখি, সে শুধু ভুক্তভোগী না।
সে রাগ করে, সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের স্বার্থ বোঝে। নদী তার জন্য শুধু প্রকৃতি না—এটা টিকে থাকার অর্থনৈতিক ও অস্তিত্বগত যুদ্ধক্ষেত্র।
অন্যদিকে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর দুর্গা—
সে চুরি করে, ধরা পড়ে, শাস্তি পায়
কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই
তার জীবন মূলত পরিস্থিতির প্রবাহে গঠিত হয়, সে সেই প্রবাহ গঠন করে না
এখানে বিষয়টা নৈতিক না।
এটা ন্যারেটিভ নির্মাণের পার্থক্য।
“বাংলা সাহিত্য প্রান্তিক মানুষকে সীমিতভাবে দেখায়”—এভাবে বলা একধরনের অতিসরলীকরণ।
কারণ মূলধারার বাংলা সাহিত্যেই আমরা দেখি ভিন্ন ভিন্ন মডেল—
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রান্তিক চরিত্রকে সিদ্ধান্তক্ষম দেখান
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: শ্রেণি ও ইতিহাসকে রাজনৈতিক চেতনায় রূপ দেন
হাসান আজিজুল হক: অভ্যন্তরীণ সংকট ও নৈতিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে তুলে ধরেন
শহীদুল জহির: ভাষা ও বাস্তবতার প্রচলিত কাঠামো ভেঙে দেন
অর্থাৎ সমস্যা অনুপস্থিতির না, সমস্যা হলো এজেন্সির মাত্রা (degree of agency)।
দুর্গা বনাম তমিজের বাপ- এই দুই চরিত্রের মধ্যে প্রায় ৫০ বছরের ব্যবধান, কিন্তু প্রশ্ন একই—কে গল্পটা চালায়?
দুর্গা চুরি করে ধরা পড়ে, মার খায়।
সে কষ্ট অনুভব করে, কিন্তু পরিস্থিতি বদলানোর ক্ষমতা তার নেই।
তার জীবন মূলত ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে ঘটে যায়, সে সেই ঘটনাগুলো তৈরি করে না।
তমিজের বাপ, সে তেভাগা আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, জেনেও যে এতে মৃত্যু হতে পারে।
সে শুধু ভুক্তভোগী না, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তার জীবন ইতিহাসের অংশ তৈরি করে এবং ইতিহাসের প্রবাহে প্রভাব ফেলে।
এই তুলনা দেখায়—প্রান্তিকতা মানেই নিষ্ক্রিয়তা না।
বরং সাহিত্যে তাদের সক্রিয়তার মাত্রা ভিন্নভাবে নির্মিত হয়।
একটি প্রচলিত যুক্তি হলো—“তৎকালীন লেখকদের সামাজিক ও ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা ছিল।”
এই যুক্তি আংশিকভাবে সত্য।
কিন্তু একই ঐতিহাসিক সময়ে থেকেও সব লেখক একইভাবে দেখেননি। কেউ বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, কেউ ভেঙে দেখেছেন, কেউ আবার ভেতর থেকে পুনর্গঠন করেছেন।
অর্থাৎ বিষয়টা শুধু সময়ের না—এটা দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতার প্রশ্ন।
বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষ অনুপস্থিত না। তারা উপস্থিত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা কি নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণে আছে?
তারা কখনো—
করুণার প্রতীক
কখনো নৈতিক উদাহরণ
কখনো ব্যাকগ্রাউন্ড উপাদান
কিন্তু খুব কম সময় তারা “decision-maker” হিসেবে উপস্থিত।
এটাই মূল সংকট—ন্যারেটিভ কন্ট্রোল কার হাতে?
এখানে ইউটোপিয়া নয়, বাস্তব কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।
মির্জাপুরের একটি স্কুলে ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীরা শ্রমজীবী মানুষের গল্প ভয়েস রেকর্ড করে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করেছিল।
এ ধরনের উদ্যোগ দেখায়—বড় ফান্ড ছাড়াও লোকাল লেভেলে কণ্ঠ সংরক্ষণ সম্ভব।
এডিটরের ভূমিকা হওয়া উচিত ভাষা “স্ট্যান্ডার্ডাইজ” করা নয়, বরং অভিজ্ঞতাকে অনুবাদযোগ্য করা।
কণ্ঠ বদলানো যাবে না—শুধু প্রকাশের কাঠামো ঠিক করা যাবে।
সব পাঠক শুরুতেই কাঁচা বাস্তবতা গ্রহণে প্রস্তুত থাকে না।
কিন্তু সাহিত্য নিজেই সময়ের সাথে পাঠক তৈরি করে—রুচি, সংবেদনশীলতা এবং গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে বদলায়।
বাংলা সাহিত্যের মূল সমস্যা প্রান্তিক মানুষের অনুপস্থিতি না।
সমস্যা হলো—তারা কতটা নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণে আছে।
কিছু চরিত্র শুধু ভোগ করে,
কিছু চরিত্র সিদ্ধান্ত নেয়,
আর কিছু চরিত্র ইতিহাসের গতিপথ বদলায়।
সাহিত্যের কাজ হলো এই তিন স্তরকেই একসাথে দেখা—একটাকে অন্যটার বিকল্প বানানো না।
যেদিন রিকশাওয়ালা, কৃষক, বা ল্যাম্পপোস্টের নিচের ছেলেটা শুধু গল্পের অংশ না হয়ে নিজের গল্পের লেখক হবে,
সেদিনই বাংলা সাহিত্য করুণার দলিল থেকে সিদ্ধান্তের দলিলে রূপান্তরিত হবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।