শিশুদের হারানো শৈশব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলম | মার্চ ০১,২০২৬
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মিরপুরের বাসা থেকে বের হলাম। রাস্তার ধারে একটা খোলা মাঠ দেখে থেমে গেলাম। সেই মাঠে আমি ছোটবেলায় ফুটবল খেলতাম। মাটি ছিলো নরম, বৃষ্টির পর কাদা থাকতো। এখন? কংক্রিট। পার্কিং। গাড়ি দাঁড়ানো। একটা কুকুর পর্যন্ত নেই।
পাশেই "স্মার্ট টিউটোরিয়াল" — তিনতলা। কাঁচের জানালা। ভেতরে টিউবলাইটের আলো। জানালা দিয়ে দেখলাম, ছোট ছোট মুখ। সবাই টেবিলে বসে। একটা ছেলে, বয়স নয় বা দশ, মাথা নিচু করে ঘুমাচ্ছিলো। কেউ তাকে ধাক্কা দিলো। মাথা তুললো। চোখ লাল। আবার বইয়ে তাকালো।
আরেকটা ছেলে জানালার কাছে এলো। আমার দিকে নয় — আকাশের দিকে তাকালো। মেঘ ছিলো না। নীল। সে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলো? জানি না। কেউ ডাকলো — "রিয়াদ, বসো!" সে ফিরে গেলো। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কতক্ষণ? জানি না। একটা গাড়ি বাজার দিলো। তবু দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ওর নাম জানি না — রিয়াদ নাকি অন্য কিছু। কিন্তু চোখ মনে আছে। খালি চোখ। যেন কিছু চায়, কিন্তু কী চায় বোঝে না। আমরা বড়রা তো বুঝি? বুঝি না। বুঝলে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতাম না। চলে যেতাম। কিন্তু গেলাম না। কেন?
আমার ভাগ্নে রাফি। ক্লাস ফোরে পড়ে। গত ঈদে দেখা হলো। লাল টি-শার্ট পরেছিলো — ওর মা কিনেছিলো, কিন্তু ওর পছন্দ ছিলো না। নীল চেয়েছিলো। কিন্তু বলেনি। শুধু নাক টিপে টিপে কথা বলছিলো। ওর বাবার অভ্যাস। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কি করিস?" নাক টিপলো। বললো, "কোচিং।" আর? "আর কিছু না।" খেলো? "সময় নাই।" কথা বলার সময় ওর মা ডাক দিলেন — "রাফি, অনলাইন ক্লাস শুরু হবে।" রাফি দৌড়ে গেলো। লাল টি-শার্টটা পিঠে কুঁচকে ছিলো। আমি বসে রইলাম।
সোফায় একটা বই পড়েছিলো। "ম্যাথ প্র্যাকটিস" — কিন্তু ভেতরে ছবি আঁকা। একটা বাড়ি, একটা গাছ, একটা সূর্য। সূর্যের পাশে লেখা — "৪৫° এঙ্গেল।" কে লিখেছিলো? রাফি নাকি শিক্ষক? জানি না। কিন্তু সূর্যের পাশে কেন ডিগ্রি? সূর্য তো উঠে। শুধু উঠে। কেউ জিজ্ঞেস করে না কতটা উঠে। শুধু দেখে। আমরা দেখতাম। এখন?
রাফির বাবা বলেছিলেন — চা খাওয়ার সময়, কাপ হাতে। কাপটা পুরনো, ফাটা ছিলো নিচে। চা পড়ছিলো টেবিলে। তবু ধরেছিলেন। বললেন, "এখন কম্পিটিশন বেশি।" হ্যাঁ, বেশি। কিন্তু কার সাথে? অন্য রাফিদের সাথে? যারাও নাক টিপে টিপে কথা বলে, নীল চায়, কিন্তু পায় না? এই কম্পিটিশনে জিতলে কি মিলবে? জীবন? নাকি আরেকটা পরীক্ষা? আরেকটা কোচিং? আরেকটা "স্মার্ট টিউটোরিয়াল"?
তাহলে কি? কেউ জানে না। কিন্তু সবাই ভয় পায়। এই ভয়টাই শিশুদের হাতে তুলে দিই আমরা। ছোট ছোট হাতে। যে হাতে খেলনা থাকার কথা, সেখানে ভয়। ভয় না পেলে ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে। কী ক্ষতি? কেউ বলতে পারে না। কিন্তু সবাই বলে। বলে যাই। বলে যাই। আর ওরা? ওরা নেয়। নাক টিপে টিপে। চোখ বড় বড় করে। আকাশের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ। তারপর ডাক পড়ে। ফিরে আসে।
আমার মা বলতেন, "বিকেলে বাইরে যাস না, পড়াশোনা কর।" কিন্তু তখনো বিকেল ছিলো। এখন? এখন তো সকাল থেকে রাত। স্কুল, কোচিং, অনলাইন, হোমওয়ার্ক। আর ফাঁকে ফাঁকে? ফাঁকে ফাঁকে ফোন। স্ক্রিন। ইউটিউব। কার্টুন না, "এডুকেশনাল কন্টেন্ট।" শেখার নামে আরেকটা চাপ। ছোট ছোট চোখে বড় বড় স্ক্রিন। ঘুম আসে না। চোখ জ্বলে। ডাক্তার বলে, "স্ক্রিন টাইম কমাও।" কী করে কমাবে? পড়াশোনা তো স্ক্রিনেই। এই চক্র। বের হওয়ার পথ নেই। নেই। নেই।
শৈশব হারানো মানে শুধু খেলার অভাব নয়। এটি জিজ্ঞেস করার অভাবও। আমরা কখনো প্রশ্ন করি না — "তুমি কি চাও?" বলি, "তুমি এটা করো।" ওরা করে। নাক টিপে টিপে। চোখ বড় বড় করে আকাশের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ। তারপর ফিরে আসে। ক্লাসে। কোচিংয়ে। এই চক্রে কত শিশু ঘুরছে? গুনি নি। গুনতে ভয় লাগে। লাগে। লাগে।
ভয় — এই ভয় কি আমরা ওদের হাতে দিচ্ছি? নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন? নিজের ব্যর্থতা? "আমি পারিনি, তুমি পারবে" — এই বাক্য কত ভারী? ছোট ছোট কাঁধে। ওরা পড়ে না। ভাঙে না। কিন্তু ভেতরে কী ঘটে? কেউ দেখে না। দেখার সময় নেই। পরীক্ষা আসছে। কম্পিটিশন চলছে। চলবে। চলবে।
আমরা ভাবি আমরা সব ঠিক করছি। পরিকল্পনা করছি। ভবিষ্যৎ গড়ছি। কিন্তু কার ভবিষ্যৎ? আমাদের না ওদের? ওদের যদি জিজ্ঞেস করতাম? করি না। করলে উত্তর জানি — "আমি ছবি আঁকতে চাই।" "আমি খেলতে চাই।" "আমি ঘুমাতে চাই।" এই উত্তরগুলো আমাদের কাজের নয়। তাই জিজ্ঞেস করি না। করি না। করি না।
শৈশব হারানো মানে হারানো আনন্দ, হারানো স্বাধীনতা, হারানো শিশুমন। আর যখন হারানো যায়, ফিরে আসে না। আমি সেই মাঠে আর ফুটবল খেলি না। কংক্রিটে পা ব্যথা করে। কিন্তু মাঝে মাঝে যাই। দাঁড়াই। জানালার দিকে তাকাই। কেউ কেউ তাকায়। কেউ দেখে না। ব্যস্ত। আমরা ব্যস্ত। ওরা ব্যস্ত। সবাই ব্যস্ত। ব্যস্ত হয়ে শৈশব হারাই। হারাই। হারাই।
রাফি এখনো কোচিং যায়। লাল টি-শার্টটা এখনো আছে — ছোট হয়ে গেছে। ওর মা নতুন কিনবেন। নীল। কিন্তু রাফি আর চায় না। কিছুই চায় না। শুধু ঘুমাতে চায়। বলে না। বললে ক্লাস মিস হবে। আর সেই নাম না জানা ছেলেটা? রিয়াদ? সে কি আকাশ দেখতে পায় এখনো? নাকি তাকে চিরকাল ডেকে নিয়েছে? জানি না। জানব না। কারণ আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি। লিখি। আর কিছু করি না। করি না। করি না।
আপনি কি মনে করেন এই দিন আসবে, যখন শিশুরা আকাশ দেখবে — ড্রিলিং নয়, স্বপ্ন দিয়ে? আমি মনে করি না। কিন্তু মাঝে মাঝে যাই। দাঁড়াই। তাকাই। অপেক্ষা করি। কী? জানি না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকি। কংক্রিটের উপর। পা ব্যথা করে। চলে যেতে ইচ্ছে করে। যাই না।
#শৈশবহারানো #শিশুমনস্বাস্থ্য #শিক্ষারচাপ #প্রজন্মহারানো #মানবিকশিক্ষা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।