রাখীর দায়
শুভ রাখীবন্ধন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২৭ আগষ্ট, ২০২৬
রাখীর দিন এলেই ছোটবেলার একটা দৃশ্য মনে পড়ে। বোনের হাতে নতুন রাখী, ভাইকে ধরে বসানোর চেষ্টা, ভাইয়ের দুষ্টুমি, বোনের রাগ। তারপর মিষ্টি খাওয়া, হাসাহাসি। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে রাখীটা কয়েকদিন হাতে থাকে, তারপর একসময় খুলে যায়।
ছোটবেলায় এসবের অর্থ বুঝতাম না। তখন ভাই-বোনের সম্পর্ক ছিল খুব সহজ। একই ঘরে বড় হওয়া, একজনের জিনিস আরেকজনের অনুমতি ছাড়া নিয়ে নেওয়া, মায়ের কাছে নালিশ করা, আবার কিছুক্ষণ পরেই পাশাপাশি বসে থাকা। ঝগড়া হতো, অভিমান হতো, কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে হিসাব ঢোকেনি।
বড় হওয়ার পর হিসাব ঢোকে।
ভাই চাকরির জন্য অন্য শহরে যায়। বোন বিয়ের পর অন্য সংসারে। কারও সন্তান হয়, কারও ব্যবসা, কারও চাকরি, কারও নিজের সংসারই ঠিকমতো চলে না। বাবা-মা যতদিন থাকেন, তাঁদের বাড়িটা কোনোভাবে সবাইকে এক জায়গায় টেনে রাখে। তারপর একদিন সেই বাড়িটাও ফাঁকা হয়ে যায়।
তখন বোঝা যায়, রক্তের সম্পর্ক থাকলেই মানুষ কাছের থাকে না।
কাছের থাকতে হয়।
এই জায়গাটাই রাখীবন্ধনের আসল প্রশ্ন।
যার হাতে রাখী বাঁধছি, তার জীবনে আমার জায়গাটা কোথায়?
শুধু উৎসবের দিনে? ছবি তোলার সময়? নাকি তার খারাপ সময়েও?
আমাদের অনেক সম্পর্ক আসলে ঝগড়ায় ভাঙে না; ভাঙে দীর্ঘদিন কথা না বলায়। একজন ভাবে, “সে তো ব্যস্ত।” অন্যজন ভাবে, “ওর নিজের সংসার আছে।” কেউ ফোন করে না। কেউ অভিমান ভাঙায় না। একটা ছোট দূরত্ব ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখান থেকে ফিরে আসতে দুজনেরই অস্বস্তি হয়।
তারপর একসময় বুঝি, যাকে খুব আপন ভাবতাম, তার সঙ্গে কথা বলার জন্যও একটা উপলক্ষ দরকার হয়।
রাখী সেই উপলক্ষ হতে পারে।
তবে রাখী শুধু ভাইয়ের হাতে সুতো বাঁধার অনুষ্ঠান নয়। এর ভেতরে দায়িত্বের কথাও আছে। কিন্তু দায়িত্ব মানেই শুধু ভাই বোনকে রক্ষা করবে, এমন নয়।
ভাইও দুর্বল হতে পারে।
বোনও আশ্রয় হতে পারে।
আজ যে ভাই পরিবারের সবার দায়িত্ব নিচ্ছে, কাল হয়তো তার নিজের প্রয়োজন হবে। আজ যে বোন সবাইকে সামলে রাখছে, কোনো এক রাতে হয়তো তার নিজেরই কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করবে।
সেই জায়গায় ভাই-বোনের সম্পর্ক অন্যরকম হয়ে ওঠে।
আর সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে তখন, যখন বাবা-মা অসুস্থ হন।
হাসপাতালের বিল কে দেবে, কে রাত জাগবে, কে ওষুধ আনবে—এসব নিয়েও ভাই-বোনের মধ্যে হিসাব হতে পারে। একজন হয়তো বিলটা দিল, আরেকজন সারারাত হাসপাতালের করিডরে বসে থাকল। সকালে দুজনের চোখেই ঘুম নেই, অথচ কে বেশি করল সেই হিসাবের কোনো মিল নেই।
সব দায়িত্ব টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
আবার সবাই সমান সামর্থ্য নিয়েও জন্মায় না। কারও হাতে টাকা থাকে, সময় থাকে না। কারও সময় থাকে, টাকা থাকে না। কেউ হয়তো কোনোভাবেই বড় কিছু করতে পারে না, শুধু প্রতিদিন ফোন করে খবর নেয়।
এই পার্থক্যটা বুঝতে না পারলে ভালোবাসার জায়গাতেও একসময় হিসাবের খাতা খুলে যায়।
সম্পত্তির সময় সেই খাতাটা আরও মোটা হয়।
বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া বাড়ি, জমি বা টাকা নিয়ে ন্যায্য অধিকার অবশ্যই থাকবে। অন্যায় হলে কথা বলতেও হবে। কিন্তু কখনো কখনো দেখি, ভাগের হিসাব করতে গিয়ে মানুষগুলোই যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।
টেবিলের ওপর দলিলের ফটোকপি।
এক পাশে উকিলের কাগজ।
কেউ বলছে, “এই অংশটা আমার।”
কেউ পুরোনো আলমারির চাবিটা শক্ত করে ধরে আছে।
আর যে ঘরটায় একসময় ভাই-বোন পাশাপাশি ঘুমাত, সেই ঘরের জিনিসপত্রেরও তখন আলাদা মালিক তৈরি হয়।
কাগজে ভাগ করা যায় বাড়ি।
জমির মাপও ভাগ করা যায়।
টাকাও ভাগ হয়ে যায়।
শুধু শৈশবের সেই দুপুরগুলো ভাগ করা যায় না।
এই জায়গাটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি মনে রাখা দরকার।
ভাই-বোনের সম্পর্ক সবসময় ভালো থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাগ হবে, মতের অমিল হবে, এমনকি কিছু সময় দূরত্বও থাকতে পারে। সব অভিমান ভুলে যেতে হবে—এমন কথাও নেই।
শুধু দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ না করলেই হয়।
যেন বিপদে পড়লে ফোন করা যায়।
যেন বহুদিন পর দেখা হলে অস্বস্তির বদলে একটা পুরোনো হাসি ফিরে আসে।
যেন কেউ বলতে পারে—
“তোর ওপর রাগ আছে, কিন্তু তুই পর হয়ে যাসনি।”
এইটুকু সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে।
রাখী একদিন খুলে যাবে। সুতো ছিঁড়ে যাবে। মিষ্টির বাক্স খালি হবে। ছবিগুলোও একদিন ফোনের পুরোনো অ্যালবামে চলে যাবে।
তবু আজকের এই ছোট্ট উৎসবের ভেতর যদি একটা দরজা খোলা থাকে, সেটাই অনেক।
কারণ জীবন আমাদের আলাদা করে দিতে পারে, অভিমান দূরে সরিয়ে দিতে পারে, হিসাব আমাদের মধ্যে দেয়াল তুলতে পারে।
কিন্তু দরজাটা যদি পুরোপুরি বন্ধ না করি, ফিরে আসার একটা পথ থেকে যায়।
শুভ রাখীবন্ধন।
আর হয়তো রাখীর আসল দায়টুকু এই—
তোর ওপর রাগ থাকতে পারে, কিন্তু তুই পর হয়ে যাসনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।