জীবনের রঙ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন |
বিশ্লেষণধর্মী। জানুয়ারি ০১, ২০২৬
থেমে দাঁড়ানোর সময়টা আমাদের খুব কম। সকালে ঘুম ভাঙে, চোখ মেলতেই ফোনের নোটিফিকেশন, তারপর ছুটে চলা—অফিস, মিটিং, বাড়ি ফেরা, রাতের খাওয়া-দাওয়া। এর মাঝে কোথায় থামব? কোথায় শুনব নিজের হৃদয়ের ধুকপুকানি?
আমরা ভুলে যাই, জীবন শুধু কাজের তালিকা নয়, এটা রঙের খেলা।
আমি আজ সকালে জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়ালাম। নতুন বছরের প্রথম দিন। শহরের রোদটা এখনো মৃদু, যেন লজ্জায় লুকিয়ে আছে মেঘের আড়ালে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।
দূরে কোথাও একটা কাক ডাকছে। চোখ বন্ধ করলাম। ভাবলাম—আমার জীবনটা কি সত্যিই রঙিন, নাকি শুধু ধূসর ছায়ায় ঢাকা?
জীবন কখনো কালো-সাদা হয় না। এটা লাল—প্রেমের উষ্ণতায়, রাগের আগুনে, ক্ষতের রক্তে।
সবুজ—আশার কচি পাতায়, বসন্তের নতুন ফুলে, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের পুনর্জন্মে। নীল—একাকীত্বের গভীরতায়, স্মৃতির শান্ত জলে, আকাশের অসীমে। আর হলুদ—ছোট্ট সুখের ঝলকে, সকালের চায়ের কাপে, বাচ্চার হাসিতে।
কিন্তু আমরা এই রঙগুলো দেখি কতটুকু? আমরা তো সবসময় স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকি। চাকরি, বেতন, প্রমোশন, বাড়ি, গাড়ি—এগুলোই যেন জীবনের একমাত্র মাপকাঠি।
লক্ষ্য পূরণের ধূসর পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ভুলে যাই, পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রঙের নদী। হাসি চাপি, কান্না লুকাই, ভয় পাই—যদি থেমে যাই, তাহলে পিছিয়ে পড়ব।
আমার মনে পড়ে একটা দিন, বছর পাঁচেক আগের। বৃষ্টির মধ্যে অফিস থেকে ফিরছি। রাস্তার পাশে একটা ছোট চায়ের দোকান। ভিজে গিয়েছি পুরোপুরি। দোকানদার এক কাপ চা এগিয়ে দিল। পাশে বসা এক অচেনা লোক, বয়স্ক, দাড়ি-গোঁফ সব সাদা। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আমিও হাসলাম। কোনো কথা নয়, শুধু একটা হাসি।
কিন্তু সেই হাসিতে যেন সব রঙ ফিরে এল। লালের উষ্ণতা, সবুজের সতেজতা, হলুদের আলো। বৃষ্টি তখনো পড়ছে, কিন্তু মনের ভিতরে রোদ উঠে গিয়েছিল।
আজকাল এমন মুহূর্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমরা এত তাড়াহুড়ো করি যে, ছোট ছোট রঙগুলো দেখার সময় থাকে না। বাচ্চা যখন প্রথমবার “বাবা” বলে ডাকে, আমরা ফোনে ব্যস্ত। মা যখন রান্নাঘর থেকে ডাকেন, আমরা হেডফোন কানে।
বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা গালে লাগে, আমরা ছাতা মেলি। আমরা ভয় পাই—যদি থামি, জীবন থেমে যাবে। কিন্তু সত্যি ঠিক উল্টো। থামলে তবেই জীবন শুরু হয়।
জীবন শুধু বড় অর্জন নয়। এটা ছোট ছোট মুহূর্তের সমষ্টি। গরম চায়ের কাপ হাতে জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা। বাসের জানালা দিয়ে হঠাৎ দেখা সূর্যাস্ত। বন্ধুর সঙ্গে রাত জেগে আড্ডা।
মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ। এগুলোই রঙ। এগুলোই জীবনের মূল সুর।
যে মানুষ হাসতে ভয় পায়, কাঁদতে ভয় পায়, সে নিজের জীবনের রঙগুলোকে নিজেই মুছে ফেলে। কান্না চাপলে চোখের জল শুকিয়ে যায় না, হৃদয়ে জমে। হাসি চাপলে মুখ হাসে না, মন অন্ধকার হয়। আমাদের দরকার শুধু একটু সাহস—রঙগুলোকে গ্রহণ করার সাহস। লালকে ভয় না পেয়ে আলিঙ্গন করা। নীলকে ভয় না পেয়ে ডুব দেওয়া। সবুজকে বিশ্বাস করা। হলুদকে উদযাপন করা।
আজ নতুন বছরের প্রথম দিন। আজ একটা প্রতিজ্ঞা করুন। প্রতিদিন একটা মুহূর্ত থামবেন। শুধু দেখবেন। শুনবেন। অনুভব করবেন। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগলে ভিজতে দিন। রোদের আলো চোখে লাগলে চোখ বন্ধ করে অনুভব করুন। কারো হাসি দেখলে নিজেও হাসুন। কেউ কাঁদলে পাশে বসুন।
জীবনের রঙগুলো কোথাও হারায়নি। ওগুলো এখনো আছে—আপনার চারপাশে, আপনার ভিতরে। শুধু থামতে হবে। দেখতে হবে। অনুমতি দিতে হবে নিজেকে—রঙিন হতে।
আজ আপনার জীবনের কোন রঙটা সবচেয়ে উজ্জ্বল লাগছে?
আমারটা হলুদ—নতুন বছরের প্রথম রোদের মতো।
#জীবনেররঙ #থামোএকটু #রঙিনজীবন #নতুনবছর #আশারআলো #ছোটমুহূর্ত #হাসিকান্না #অনুভব #মানবিকতা #সচেতনতা #ভালোবাসা #সবুজআশা #হলুদসুখ #নীলশান্তি #লালউষ্ণতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।