মায়ের পক্ষপাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৬ অক্টোবর ২০২৬
একটি বাড়িতে সবচেয়ে বেশি রাজনীতি কখনো কখনো বাইরের মানুষ করে না, করে ঘরের আপনজনেরাই। আর সেই রাজনীতির কেন্দ্রে যখন একজন মা থাকেন, তখন বিষয়টি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। কারণ, মায়ের কাছে সন্তান প্রত্যাশা করে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ন্যায্যতা আর নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই মা যখন এক সন্তানকে বেশি পছন্দ করেন, তখন তাঁর পছন্দের প্রভাব শুধু ওই সন্তানেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে তার স্ত্রী, সন্তান এবং পুরো পরিবারের মধ্যে।
দেখা যায়, যে ছেলেকে মায়ের বেশি পছন্দ, তার ভুলও সহজে ক্ষমা পেয়ে যায়। সে অন্যায় করলেও তার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো হয়। তার স্ত্রী কোনো ভুল করলে সেটি পরিস্থিতির কারণে হয়েছে বলে মেনে নেওয়া হয়, আর তার সন্তানদের দুষ্টুমিও আদরের চোখে দেখা হয়। অথচ অন্য ছেলের সামান্য ভুলও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। তার স্ত্রী যত ভালোই হোক, কোথাও না কোথাও দোষ খুঁজে বের করা হয়। তার সন্তানদের স্বাভাবিক আচরণও কখনো কখনো বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই বৈষম্য অনেক সময় প্রকাশ্যে হয় না। কথার ভঙ্গিতে, আচরণের সূক্ষ্ম পরিবর্তনে, আদর-যত্নের পার্থক্যে কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে বউটি একসময় পরিবারের অংশ হয়ে উঠতে চেয়েছিল, সে নিজেকে বাইরের মানুষ ভাবতে শুরু করে। যে নাতি-নাতনি দাদির কাছে সমান আদর পাওয়ার কথা, তারাও বুঝতে শেখে—এই বাড়িতে ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার যেন সবার সমান নয়।
একজন মায়ের নিজের কোনো সন্তানকে বেশি ভালো লাগতেই পারে। মানুষের অনুভূতি সব সময় সমান হয় না। কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে অন্য সন্তানকে ছোট করা, তার স্ত্রীকে অবহেলা করা কিংবা নাতি-নাতনিদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করা কখনোই ন্যায়সংগত নয়। ভালোবাসার অনুভূতি সমান না-ও হতে পারে, কিন্তু আচরণে ন্যায্যতা থাকা জরুরি।
একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ছেলের স্ত্রীকে অপছন্দ করার কারণে সেই ছেলের সন্তানদের প্রতিও বিরূপ হওয়া আসলে নিরপরাধ শিশুদের ওপর অন্যায়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। তারা তো কোনো পারিবারিক দ্বন্দ্বের জন্য দায়ী নয়। তারা শুধু দাদির একটু আদর, একটু স্নেহ আর একটু আপন করে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকে। সেই জায়গায় অবহেলা পেলে তাদের ছোট্ট মনেও এমন ক্ষত তৈরি হতে পারে, যার গভীরতা বড় হওয়ার পরও থেকে যায়।
আর যে ছেলেটি বারবার মায়ের কাছ থেকে অবহেলা পায়, তার কষ্টও কম নয়। সে হয়তো মুখ ফুটে কিছু বলে না। মাকে কষ্ট দিতে চায় না বলে নিজের অভিমান চেপে রাখে। কিন্তু প্রতিবার অন্যায়ভাবে দোষী হওয়া, নিজের পরিবারের প্রতি অবজ্ঞা দেখা কিংবা ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা সহ্য করতে করতে একসময় তার মনে দূরত্ব তৈরি হয়। তখন মা হয়তো ভাবেন, ছেলে বদলে গেছে। অথচ সেই পরিবর্তনের পেছনে জমে থাকা অভিমানটুকু তিনি কখনো বুঝতেই চাননি।
মায়ের প্রতি সম্মান রাখা আর মায়ের প্রতিটি আচরণকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়। মা বলেই তাঁর পক্ষপাতের সমালোচনা করা যাবে না—এমন ধারণাও ঠিক নয়। একজন মা তাঁর সন্তানদের জন্য যেমন ত্যাগ স্বীকার করেন, তেমনি তাঁর আচরণেও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন। পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে হলে শুধু সন্তানদের মানিয়ে চলার কথা বললে হবে না; মাকেও নিজের আচরণ নিয়ে ভাবতে হবে।
তাই সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে মায়েদেরও নিজের আচরণ নিয়ে ভাবা জরুরি। কারণ, সন্তান শুধু জন্ম দেওয়ার নাম নয়; তাকে ন্যায্যতা, সম্মান এবং মানসিক নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বও এর সঙ্গে জড়িত। নিজের কোনো সন্তানকে বেশি ভালো লাগতেই পারে, কিন্তু সেই পছন্দের কারণে অন্য সন্তানকে অবহেলা করা কিংবা তার স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা উচিত নয়। পরিবারের প্রতিটি সদস্য যেন নিজেকে আপন ও সম্মানিত মনে করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করাও একজন মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মা হওয়া শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া নয়, প্রত্যেক সন্তানের কাছে ন্যায্য আশ্রয় হয়ে ওঠাও। নিজের পছন্দের সন্তানকে ভালোবাসুন, কিন্তু সেই ভালোবাসার কারণে অন্য সন্তানকে বঞ্চিত করবেন না। কারণ, সন্তান বড় হয়ে গেলেও মায়ের কাছে সমান মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায় না।
একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়; সেই সম্পর্কের ভেতরে থাকা সম্মান, ন্যায্যতা আর ভালোবাসা। পক্ষপাত দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে একজনকে কাছে রাখা যায়, কিন্তু অন্যজনের মনে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা একদিন পুরো পরিবারকেই আলাদা করে দিতে পারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।