ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ধর্ম-সংস্কার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৩, ২০২৬
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-কে ভাবতে গেলে আমার কাছে প্রশ্নটা আর সাধারণ থাকে না—ধর্ম কি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়মের কাঠামো, নাকি মানুষের জীবনকে বোঝার একটি চলমান পদ্ধতি? বিদ্যাসাগরের কাজ দেখলে মনে হয়, তিনি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সরাসরি সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে।
উনিশ শতকের বাংলায় বিধবা নারীর জীবন শুধু সামাজিক নয়, ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রিত ছিল। এই জায়গাতেই বিদ্যাসাগরের হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ—তিনি সমস্যাটিকে কেবল “সংস্কার” হিসেবে দেখেননি, বরং “ব্যাখ্যার লড়াই” হিসেবে ধরেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা (১৮৫৫)-এ তিনি সরাসরি শাস্ত্রের ভেতরে ঢুকে যুক্তি দাঁড় করান।
এখানেই তাঁর কৌশল আলাদা। তিনি মনুসংহিতা-র কঠোর বিধানকে পাশ কাটিয়ে পরাশর সংহিতা-কে সামনে আনেন, যেখানে কলিযুগে বিধবার পুনর্বিবাহের অনুমোদনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, তিনি শাস্ত্র অস্বীকার করেননি—বরং শাস্ত্রের মধ্যেই বিকল্প “টেক্সট-পলিটিক্স” তৈরি করেছেন।
এই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ: বিদ্যাসাগর ধর্মের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলেননি; তিনি ধর্মের ভেতরেই লড়াই করেছেন। তাঁর প্রতিপক্ষ রাধাকান্ত দেব ও ধর্মসভা মনুসংহিতার কর্তৃত্ব দেখিয়ে বিধবাবিবাহের বিরোধিতা করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর পাল্টা যুক্তি দেন—ধর্ম একমাত্রিক নয়, বরং তার ভেতরেই বহু ব্যাখ্যার সম্ভাবনা আছে।
এই সংঘর্ষের ফল শুধু তাত্ত্বিক ছিল না। ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়, যা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের দরজা খুলে দেয়। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন শেষ হয় না। আইন পাস হওয়া মানেই কি সমাজ বদলানো? বাস্তবে বিধবা বিবাহ খুব সীমিত পরিসরে রয়ে যায়।
এই জায়গাতেই বিদ্যাসাগরের ধর্ম-সংস্কারের শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা একসাথে ধরা পড়ে। তিনি যুক্তি দিয়ে শাস্ত্রের দরজা খুলেছিলেন, কিন্তু সমাজের মানসিকতা তত দ্রুত বদলায়নি। আরও তীক্ষ্ণভাবে বললে—তিনি টেক্সট জিতেছিলেন, কিন্তু সম্পূর্ণ সমাজ জিততে পারেননি।
তাঁর অবস্থানকে “মধ্যপন্থা” বললে ভুল হবে। তিনি আসলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিলেন—ঐতিহ্যের ভেতরে ঢুকে তাকে বদলানোর চেষ্টা। এই পথ সহজ নয়, কারণ এতে দুই দিক থেকেই চাপ আসে: রক্ষণশীলরা আপনাকে বিশ্বাসঘাতক ভাববে, আর চরম প্রগতিশীলরা আপনাকে যথেষ্ট সাহসী মনে করবে না।
সবশেষে, বিদ্যাসাগরের ধর্ম-সংস্কার আমাদের একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি সত্যের সামনে দাঁড় করায়—
ধর্মকে বদলাতে চাইলে তাকে ভাঙতে হয়, নাকি তার ভেতরেই নতুন অর্থ তৈরি করতে হয়?
আমার কাছে মনে হয়, বিদ্যাসাগরের লড়াই আংশিক সফল হলেও তার গুরুত্ব কমে না। বরং এই “আংশিকতা”-ই প্রমাণ করে—সমাজ পরিবর্তন কোনো একক বিজয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যাখ্যার যুদ্ধ।
এখন প্রশ্নটা আপনার জন্য: বিদ্যাসাগরের এই কৌশল—শাস্ত্রের ভেতরে দাঁড়িয়ে পরিবর্তন আনা—আজকের সমাজেও কার্যকর, নাকি এখন সম্পূর্ণ ভাঙনের পথই বেশি প্রয়োজন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।