লাইনের শেষে যে জীবন থেমে যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলম | মার্চ ০১, ২০২৬
গত বছর ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে এক বৃদ্ধকে দেখেছিলাম। নাম জানি না, ঠিকানা জানি না। মেঝেতে এলোমেলো হয়ে বসে ছিলেন, পা ফুলে গেছে, শরীর জ্বরে টলমল করছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি—সেই দৃষ্টি যেন বলছিল, "আমার ব্যথা দ্রুত, কিন্তু তোমাদের ব্যবস্থা ধীর।"
সেদিন আমি কিছু করতে পারিনি। ভীর, হাহাকার, আর অসহায়ত্ব ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আজ লিখছি—কেন পারিনি, সেটা বোঝার জন্য।
সরকারি হাসপাতালের করিডর ভোর থেকেই জেগে ওঠে। টোকেন, সিরিয়াল, অনির্দিষ্ট অপেক্ষা। ডাক্তাররা ক্লান্ত—এটা সত্য। কিন্তু রোগ? রোগ কি মানুষ? হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল—এগুলোর কোনো টোকেন নেই। এরা আঘাত হানে নীরবে।
ঢাকা মেডিকেলের ভীড় এখন দুর্ভাগ্যের মিছিল। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক কম, বেড কম, যন্ত্রপাতি নষ্ট। স্বাস্থ্য বাজেট সীমিত। ফলে অপেক্ষার সময় বাড়ে। আর জরুরি চিকিৎসায় অপেক্ষাই মৃত্যুর অন্য নাম। এখানে কেউ ইচ্ছা করে বঞ্চিত করে না। দোষ কাঠামোর—কাঠামো ধীর, রোগ দ্রুত।
বেসরকারি হাসপাতালে দৃশ্য বদলায়। এসির ঠান্ডা বাতাস, দ্রুত পরীক্ষা। কিন্তু সেখানে মূল্য তালিকা ঝুলে থাকে। আইসিইউতে একদিন মানে মাসের আয়ের সমান ব্যয়। তখন চিকিৎসা হয়ে যায় আর্থিক যুদ্ধ। ফোন ঘোরে, ধার হয়, গয়না বিক্রি হয়। কয়েকদিন আগে এক মাকে দেখেছিলাম—কোলে জ্বরে কাঁপা সন্তান, হাতে কাঁপা নোট। কাউন্টারে বলল, "টাকা জমা দিন, তারপর ডাক্তার।" মা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না—ওষুধ কিনবেন নাকি সিরিয়াল করবেন।
যারা পারে, লড়াই চালায়। যারা পারে না, সরকারি লাইনে ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে আসার পথটুকুই অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়।
"চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু"—সংবাদপত্রে এই বাক্য ছোট। কিন্তু বাস্তবতা দীর্ঘ। দেরিতে রোগ ধরা পড়া, পরীক্ষা করাতে না পারা, ওষুধ কিনতে না পারা। মাঝপথে চিকিৎসা থেমে যায় কারণ পকেটে টাকা শেষ। পরিবার চুপ করে থাকে। কাঁদার সময় থাকে না—পরের মাসের ভাড়া তো বাকি।
দরিদ্রের মৃত্যু নাটকীয় হয় না। ঘরের কোণে, করিডরের পাশে ঘটে। পাড়ায় খবর ছড়ায়—"টাকা ছিল না।" কথাটা এত সহজে বলা হয়, যেন এটাই নিয়ম। এই মৃত্যুর স্বাভাবিকীকরণটাই ভয়ংকর। যখন মৃত্যু নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়, তখন বোঝা যায়—আমরা নীরবে কতটা নিষ্ঠুর।
আমরা ভাবি বৈষম্য মানে ধনী-গরিব পার্থক্য। কিন্তু এটা সময়ের বৈষম্য। যাদের তথ্য আছে, টাকা আছে—তারা দ্রুত চিকিৎসা পায়। যাদের কিছু নেই—তারা অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষাই জীবন কেড়ে নেয়। লাইনের শুরুতে যারা, বেঁচে যায়। লাইনের শেষে যারা, গল্প হয়ে যায়। টাকার অভাবে নয়, সময়ের অভাবে হেরে যায়।
সমস্যার শিকড় কোথায়? প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল। গ্রামে ভালো চিকিৎসা নেই, তাই সবাই শহরে ছুটে আসে। জরুরি ট্রায়াজ ব্যবস্থা নেই—গুরুতর রোগীও লাইনে দাঁড়ায়। আর জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা নেই—খরচ সরাসরি পরিবারের ওপর পড়ে।
সমাধান সহজ নয়, কিন্তু স্পষ্ট। জরুরি রোগীদের আলাদা করার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। উপজেলায় আইসিইউ ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হবে। সরকারি হাসপাতালকে ডেটাভিত্তিক পরিকল্পনায় সাজাতে হবে। আর দুর্নীতি রোধে স্বচ্ছতা আনতে হবে।
ফিরে আসি সেই বৃদ্ধের কাছে। তার কাছে স্বাস্থ্যনীতি কোনো তত্ত্ব ছিল না। তার কাছে বিষয়টি ছিল—এই মুহূর্তে শ্বাস নিতে পারছেন কি না। তার ব্যথা বাজেট বোঝে নি। তার আকুতি নীতি বোঝে নি। বোঝে নি। বোঝে নি। বোঝে নি।
স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য কেবল অর্থনীতির সমস্যা নয়—এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি শুধু রোগী নন, তিনি আমাদের ব্যবস্থার বাস্তব পরীক্ষা। যেদিন লাইনের দৈর্ঘ্য নয়, রোগীর গুরুত্বই ঠিক করবে কার জীবন বাঁচবে—সেদিন বলতে পারব বদল শুরু হয়েছে।
আমি জানি না সেই বৃদ্ধ বেঁচে আছেন কিনা। হয়তো নেই। কিন্তু তার চোখের আকুতি আমাকে তাড়া করে। লিখতে বসলে মনে হয়—কিছু একটা করতে হবে। যদিও জানি, লেখা শুধু লেখা। কিন্তু নীরব থাকা তো আরও ভয়ংকর।
তার আগে পর্যন্ত, সেই দৃষ্টি আমাদের তাড়া করে যাবে। আর আমরা লিখে যাব—যেন একদিন লাইনের শেষে মৃত্যু নয়, চিকিৎসা দাঁড়িয়ে থাকে।
আপনি কি মনে করেন এই দিন আসবে?
#স্বাস্থ্যবৈষম্য #লাইনেমৃত্যু #চিকিৎসারঅধিকার #করিডরেরজীবন #সময়েরবিচার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।