ক্ষমার আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঈদের দিন দুপুরে একজন মানুষ বছরখানেক পর মায়ের সামনে বসে বলল, “মা, আমাকে মাফ করে দিও।” সেখানে কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা হলো না। পুরোনো হিসাবের খাতা খোলা হলো না। কে ঠিক, কে ভুল, সেই বিচারও হলো না। মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার মাথায় হাত রাখলেন। এতটুকুই।
কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনাটির ভেতরেই একটা বড় প্রশ্ন আছে—ক্ষমা চাওয়া আসলে কী?
শুধু মুখে বলা, “আমি ভুল করেছি”?
নাকি ভুলের সামনে দাঁড়ানোর একটা সাহস?
বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যে এই প্রশ্নের উত্তর আলাদা ভাষায় এসেছে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, ভুলের পর মানুষের ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাটা অনেক জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামে তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়। কুরআনে ‘তওবাতুন নাসুহা’, অর্থাৎ আন্তরিক তওবার কথা বলা হয়েছে। তওবার সঙ্গে ভুলের জন্য অনুতাপ, অন্যায় ছেড়ে দেওয়া এবং আবার সেই পথে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প জড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—মানুষের হক। কারও হক নষ্ট করে শুধু জায়নামাজে বসে ক্ষমা চাইলেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। যার ক্ষতি হয়েছে, তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়, তার কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে জীবনের একটা কঠিন সত্য এসে মিশে যায়—ক্ষমা চাওয়া সহজ, ক্ষতি পূরণ করা কঠিন।
একজন স্বামী বছরের পর বছর স্ত্রীকে অবহেলা করে শেষে যদি বলে, “আমি ভুল করেছি”, কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পরের দিনগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বাবা সন্তানের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে পরে ক্ষমা চাইতে পারেন। সন্তান হয়তো ক্ষমাও করে দিতে পারে। কিন্তু আগের ভয়টা মুছে যেতে সময় লাগতে পারে। এই জায়গাটায় এসে ধর্মীয় ধারণাগুলো হঠাৎ খুব পরিচিত মনে হয়।
খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে অনুতাপ শুধু অপরাধবোধ নয়; ঈশ্বরের দিকে ফিরে আসার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
ইহুদি ধর্মে ‘তেশুভা’ শব্দের অর্থই ফিরে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভুল স্বীকার করা, অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টা করা এবং ভবিষ্যতে একই ভুল না করার চেষ্টা—এই ধারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সনাতনী ধর্মীয় ঐতিহ্যেও কর্মফল, প্রায়শ্চিত্ত ও আত্মসংযমের নানা ধারণা রয়েছে। বিভিন্ন শাস্ত্র ও ধারায় এর ব্যাখ্যা এক নয়। কোথাও ভুল কর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্তের কথা এসেছে, কোথাও আত্মসংযম ও আচরণ পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৌদ্ধধর্মের পথটি আবার ভিন্ন। সেখানে সৃষ্টিকর্তার কাছে পাপমোচনের ধারণার চেয়ে নিজের অজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষতিকর আচরণের কারণ বোঝার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভুলকে বুঝে তার কারণের দিকে তাকানো এবং আচরণ বদলানোই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ধর্মগুলোর ভাষা আলাদা। পথও আলাদা। কিন্তু মানুষের জীবনে ফিরে আসার প্রশ্নটা থেকে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি, “যদি কষ্ট পেয়ে থাকো, মাফ করে দিও।” বাক্যটার দিকে একটু খেয়াল করলে অদ্ভুত একটা ব্যাপার চোখে পড়ে।
এখানে সরাসরি বলা হচ্ছে না, “আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।” বরং বলা হচ্ছে, “যদি কষ্ট পেয়ে থাকো।” দায়টাও যেন পুরোপুরি নেওয়া হলো না। আবার ক্ষমা চাওয়ার পর অনেক সময় আমরা পুরোনো হিসাব টেনে আনি—“তুমিও তো কম ভুল করোনি।” তখন ক্ষমা আর ক্ষমা থাকে না। সেটা হয়ে যায় হিসাব মেলানোর আরেকটি পদ্ধতি।
অথচ ক্ষমা চাওয়া নিজের কাজ। ক্ষমা করা অন্য মানুষের স্বাধীনতা। আর বিশ্বাস ফিরে পাওয়া আরও দীর্ঘ একটি পথ।
কেউ ক্ষমা করলেই সম্পর্ক আগের জায়গায় ফিরে যাবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু ক্ষত শুকিয়ে যায়, দাগ থেকে যায়। কিছু সম্পর্ক টিকে যায়, কিন্তু আগের মতো থাকে না। কিছু দরজা আবার খুলে যায়। কিছু দরজা একবার বন্ধ হয়ে গেলে তার ওপাশে শুধু স্মৃতি থাকে। তবু মানুষের ভেতরে ফিরে আসার ইচ্ছাটা থেকে যায়।
প্রশ্ন শুধু একটাই—
আমরা কি সত্যিই ফিরে আসতে চাই, নাকি শুধু ক্ষমা পেতে চাই?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।