রমজানে ইফতার ছবি সংযম না প্রদর্শন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলাম | ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬
রমজানের সন্ধ্যা নামলে পৃথিবী যেন একটু ধীর হয়ে যায়। সারাদিনের ক্লান্তির পর একটি খেজুর, এক গ্লাস পানি, পরিবারের পাশে বসে ইফতার—এই ছোট দৃশ্যের ভেতরেই রোজার বড় শিক্ষা লুকিয়ে থাকে। ক্ষুধার পর প্রথম কণাটা মুখে তোলার আগে যে নীরব দোয়া, সেটি মানুষকে মনে করায়—জীবনের আসল স্বাদ কমে নয়, ভাগ করে নিতেই।
কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধীরে ধীরে প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। ইফতার এখন শুধু খাবার নয়; এটি ছবি, ফ্রেম, ক্যাপশন, আর অনেক সময় সামাজিক অবস্থানের এক নিঃশব্দ ভাষা। সামাজিক মাধ্যমে ঢুকলেই দেখা যায় দীর্ঘ মেন্যু, দামি রেস্তোরাঁর ইফতার, বিদেশি ফলের সারি। নিষেধের প্রশ্ন নয়; প্রশ্নটা উদ্দেশ্যের। সংযমের মাসে প্রদর্শনের প্রয়োজন কতটা?
একদিন কালিগঞ্জ বাজারে দাঁড়িয়ে একজন দোকানদারকে বলতে শুনেছিলাম, "ভাই, আজ ইফতারে ডাল আর মুড়িই নেব। বাচ্চাদের ফল কিনতে পারলাম না।" তার চোখে অভিযোগ ছিল না, ছিল ক্লান্তি। সেই রাতেই টাইমলাইনে দশ পদের ইফতার দেখে মনে হলো—আমরা কি একই সমাজে বাস করি?
এই প্রশ্ন ঈর্ষার নয়; এটি সংবেদনশীলতার। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবন মাপে। রমজানের সময় বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি অনেক পরিবারকে চাপে ফেলে। সেখানে বিলাসী ইফতার ছবি কখনও কখনও শুধু ছবি থাকে না; এটি সামাজিক ব্যবধানের দৃশ্যমান রূপ হয়ে ওঠে। কেউ কাউকে ছোট করতে চায় না, কিন্তু প্রদর্শনের ভাষা কখনও অজান্তেই আঘাত দেয়।
তবে বিষয়টি এত সরল নয়। সব ছবি খারাপ নয়। পরিবারের সঙ্গে ইফতার, মায়ের নতুন রান্না, দূরের বন্ধুর সাথে পুনর্মিলন—এসব স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলা স্বাভাবিক। আবার অনেক সময় ইফতার বিতরণ বা দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ছবি অন্যদের অনুপ্রাণিত করে। তাই প্রশ্নটা "ছবি দেব কি দেব না" নয়; প্রশ্নটা—আমি কী দেখাতে চাই?
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে দেখানো মানেই অস্তিত্বের প্রমাণ। কোনো মুহূর্ত পোস্ট না করলে যেন সেটি ঘটেনি। ফলে ইফতারের আগে দোয়া নয়, আগে ছবি; খাবারের আগে স্বাদ নয়, আগে ফ্রেম। অজান্তেই ধর্মীয় অনুশীলন ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সামাজিক প্রতিযোগিতায় বদলে যায়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রোজা শুধু খাদ্য থেকে বিরত থাকা নয়; এটি অভ্যাসের পুনর্গঠন। কথায় সংযম, আচরণে সংযম, প্রকাশে সংযম। কম খাওয়া যেমন রোজার শিক্ষা, তেমনি কম দেখানোও। নিজের সামর্থ্য লুকিয়ে রাখা দুর্বলতা নয়; এটি পরিপক্কতা। কারণ আধ্যাত্মিকতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা অহংকার, আর অহংকার প্রায়ই নীরব প্রদর্শনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
আরেকটি দিক ভুললে চলবে না। কেউ কেউ ছবি দেয় আনন্দে, কেউ নিঃসঙ্গতা ঢাকতে, কেউ ব্যবসার প্রয়োজনে। একজন ছোট রেস্টুরেন্ট মালিকের জন্য ইফতার মেন্যুর ছবি মানে বিক্রি বাড়ানো, কর্মচারীর বেতন দেওয়া। একজন ফুড ব্লগারের জন্য ছবি মানে পেশা। তাই সব প্রদর্শনকে একই চোখে দেখা অন্যায়। বিশ্লেষণের সততা এখানেই—বিচার করার আগে উদ্দেশ্য বোঝা।
তবে একটি সীমা আছে। যখন পোস্টের ভাষা প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়, যখন ক্যাপশনে বিনয় থাকে কিন্তু ছবিতে অহংকার, তখন সেটি আর ভাগাভাগি থাকে না। সেটি হয়ে যায় অবস্থান দেখানোর উপায়। আমরা হয়তো বুঝি না, কিন্তু অন্য কারও মনে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করি।
গত বছর এক বন্ধুর বাড়িতে ইফতার করেছিলাম। টেবিলে খুব বেশি কিছু ছিল না—ডাল, ভাজি, কয়েকটা খেজুর। কিন্তু সবাই মিলে বসে গল্প করতে করতে যে শান্তি পেয়েছিলাম, সেটি কোনো বুফেতেও পাইনি। সেদিন ছবি তুলিনি। তবু সেই সন্ধ্যা আজও মনে আছে। কারণ মুহূর্তের সৌন্দর্য ক্যামেরায় নয়, সম্পর্কের ভেতরে।
আমরা চাইলে কিছু সহজ কথা মনে রাখতে পারি। ছবি দিন, কিন্তু দেখান মানুষ—খাবারের বাহার নয়। বিলাসিতা নয়, ভাগাভাগির গল্প বলুন। প্রতি ইফতারে অন্তত একজন অভাবীকে মনে রাখুন। পোস্টের আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি কাউকে ছোট করবে?
রমজান শেষ হয়ে যাবে। পোস্টগুলো হারিয়ে যাবে অ্যালগরিদমের ভিড়ে। কিন্তু অভ্যাস থেকে যাবে। যদি এই মাসে আমরা একটু কম দেখাতে শিখি, একটু বেশি দিতে শিখি, একটু বেশি অনুভব করতে শিখি—তাহলেই রোজার শিক্ষা পূর্ণতা পায়।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ব্যক্তিগত। কেউ আপনাকে থামাবে না। কিন্তু সংযমের মাসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাইরে নয়—ভেতরে।
ইফতার কি আমার প্লেটে, নাকি আমার চরিত্রে?
যদি উত্তরটি দ্বিতীয়টি হয়, তবে ছবি নয়—মানুষই হবে রমজানের সবচেয়ে বড় প্রকাশ।
#রমজানচিন্তা #সংযমেরমাস #ইফতারসংস্কৃতি #সচেতনসমাজ #RamadanReflection
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।