নীরবতায় নিজের মুখোমুখি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সেদিন রাতে নীলা ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় বসেছিল। সারাদিনের কাজ শেষ, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ তার মাথার ভেতর কথার ভিড়। মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তা, স্বামীর সঙ্গে সকালের সামান্য মনোমালিন্য, মায়ের শরীর খারাপের খবর—সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়ছে।
হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখে পড়ল একটি লেখা। সেখানে বলা হয়েছে, নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। ধ্যানে বসে মাথার শীর্ষে হাত রেখে ঐশ্বরিক জ্ঞানের জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
নীলা কিছুক্ষণ লেখাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। তার মনে প্রশ্ন জাগল, সত্যিই কি এমন কোনো সংযোগ আছে, যা স্থাপন করতে পারলে মনের অস্থিরতা কমে যায়? নাকি মানুষ অসহায় হয়ে পড়লে নিজের চেয়ে বড় কোনো আশ্রয়ের খোঁজ করে?
প্রশ্নটির উত্তর সে সেদিনই পায়নি। তবে ফোনটি পাশে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল। প্রথমবারের মতো সে নিজের দুশ্চিন্তাগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা না করে সেগুলোর দিকে তাকাল।
সংযোগের অর্থ
ঐশ্বরিক সত্তার সঙ্গে যোগাযোগের ধারণা বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কেউ প্রার্থনার মাধ্যমে স্রষ্টার কাছে নিজের কথা বলেন, কেউ ধ্যানে বসে অন্তরের নীরবতা খোঁজেন, কেউ প্রকৃতির মধ্যে বিস্ময় অনুভব করেন। আবার কেউ বিশ্বাস করেন, মানুষের বিবেক, ভালোবাসা ও সত্যের প্রতি আকর্ষণের মধ্যেও ঐশ্বরিকতার প্রকাশ ঘটতে পারে।
এসব অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে তা ধর্মবিশ্বাসের বিষয়, কারও কাছে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অনুভূতি। তাই কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে ধ্যান করলেই অতিপ্রাকৃত কোনো বার্তা পাওয়া যাবে, কিংবা মাথার নির্দিষ্ট স্থানে হাত রাখলে ঐশ্বরিক জ্ঞান নেমে আসবে—এমন দাবি নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার কারণ নেই।
তবে একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন ঐশ্বরিক সংযোগের কথা বলে, তখন সে আসলে কী খুঁজছে?
অনেক সময় সে এমন একটি আশ্রয় খোঁজে, যেখানে নিজের ভয়, ব্যর্থতা ও অপরাধবোধ লুকাতে হবে না। এমন একটি জায়গা, যেখানে তাকে অন্যের সামনে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হবে না। জীবনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর না পেলেও যেখানে কিছুক্ষণ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায়।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই অনুসন্ধানকে কোনো বিশেষ কৌশল, গোপন সংকেত কিংবা অলৌকিক অভিজ্ঞতা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত করা হয়। মানুষ নিজের ভেতরের পরিবর্তনের বদলে বাইরের কোনো চিহ্নের অপেক্ষায় বসে থাকে।
নীরবতা কি উত্তর দেয়?
নীলা পরদিনও কয়েক মিনিট চুপ করে বসেছিল। তার সমস্যাগুলো আগের মতোই ছিল। মায়ের শরীর ভালো হয়নি, মেয়ের পরীক্ষাও শেষ হয়নি, স্বামীর সঙ্গে সকালের কথাটিও পুরোপুরি মিটে যায়নি।
তবু সে একটি বিষয় বুঝতে শুরু করল। এত দিন সে প্রতিটি সমস্যার সমাধান একসঙ্গে খুঁজতে গিয়ে নিজের মনকে আরও অস্থির করে তুলেছে। কোনো একটি চিন্তা এলেই সেটিকে সরাতে চেয়েছে, কোনো আশঙ্কা দেখা দিলেই তার উত্তর খুঁজেছে। অথচ সব প্রশ্নের উত্তর একই মুহূর্তে পাওয়া সম্ভব নয়।
নীরবে বসে থাকা তাকে কোনো অলৌকিক বার্তা দেয়নি। কিন্তু নিজের ভেতরের অস্থিরতা লক্ষ করার সুযোগ দিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও প্রতিদিন তাকে ভয় দেখিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মায়ের অসুস্থতা নিয়ে চিন্তা থাকলেও সেই চিন্তার মধ্যে ডুবে থেকে মায়ের জন্য কিছু করার ক্ষমতা হারানো ঠিক নয়।
এখানেই ধ্যান বা প্রার্থনার একটি বাস্তব মূল্য থাকতে পারে। এগুলো কারও কাছে বিশ্বাসের অনুশীলন, কারও কাছে মনোযোগ স্থির করার উপায়। তবে এর ফল নির্ভর করে ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস ও অনুশীলনের ওপর। নীরবতা নিজে সব সমস্যার সমাধান করে না; কখনো তা আমাদের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার মতো স্থিরতা তৈরি করতে সাহায্য করে।
বিশ্বাসের সঙ্গে সচেতনতা
আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ মানুষের জীবনে নতুন কিছু নয়। অনিশ্চয়তা, মৃত্যু, বিচ্ছেদ, অপরাধবোধ কিংবা জীবনের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন মানুষকে বহু যুগ ধরে নিজের চেয়ে বড় কোনো সত্যের সন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
কিন্তু এই অনুসন্ধানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কেউ যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য অদৃশ্য কোনো সংকেতের অপেক্ষা করতে থাকেন, তাহলে নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার কেউ যদি নিজের প্রতিটি অনুভূতিকেই ঐশ্বরিক নির্দেশ বলে ধরে নেন, তাহলে ভুল সিদ্ধান্তকেও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে রাখতে পারেন।
বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসের নামে বাস্তবতা যাচাই করার ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া জরুরি নয়। কোনো অনুভূতি গভীর হলেই তা বাইরের কোনো অতিপ্রাকৃত বার্তার প্রমাণ হয়ে যায় না। একইভাবে, সব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দেওয়াও মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির জটিলতাকে অস্বীকার করা।
নীলার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটা এসেছিল অন্যভাবে। সে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় ফোনের পর্দায় চোখ রাখল না। মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলল, কিন্তু নিজের ভয়কে মেয়ের ওপর চাপিয়ে দিল না। স্বামীর সঙ্গে সকালের মনোমালিন্য নিয়ে আবার কথা বলল। কোনো দেবদূত এসে তাকে এসব করতে বলেনি। নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর সে নিজেই বুঝেছিল, কোন কাজগুলো করা দরকার।
নিজের ভেতরে ফিরে দেখা
ঐশ্বরিকতার সঙ্গে সংযোগের ধারণাকে কেউ বিশ্বাসের আলোয় দেখবেন, কেউ দর্শনের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করবেন, কেউ হয়তো গ্রহণই করবেন না। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি এক হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে নীলার রাতের সেই নীরব মুহূর্তটি একটি প্রশ্ন রেখে যায়। আমরা যখন কোনো উচ্চতর শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষা করি, তখন কি সত্যিই কোনো অদৃশ্য উত্তর খুঁজি, নাকি নিজের জীবনের এমন কিছু সত্যের মুখোমুখি হতে চাই, যেগুলো এত দিন ব্যস্ততার আড়ালে এড়িয়ে গেছি?
নীলা এখনো প্রার্থনা করে, কখনো নীরবে বসেও থাকে। তার সব সমস্যার সমাধান হয়নি। সে জানে না, তার বিশ্বাসের বাইরে কোনো ঐশ্বরিক যোগাযোগ সত্যিই ঘটে কি না। কিন্তু এখন সে নিজের অস্থিরতাকে আড়াল করার বদলে চিনতে চেষ্টা করে।
সেদিন রাতে সে যে উত্তরটি পেয়েছিল, সেটি কোনো আকাশি বার্তা ছিল না। ছিল নিজের জীবনের দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকানোর সাহস।
হয়তো ঐশ্বরিকতার সন্ধান সবার কাছে একই রকম নয়। কিন্তু নিজের ভেতরের সত্যকে প্রশ্ন করার সাহসটুকু হারিয়ে ফেললে, বাইরে যত সংযোগই খুঁজি না কেন, নিজের কাছেই অচেনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।