নিজের সামনে দাঁড়ানোর সাহস
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বড় ভাই ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন। ছোট ভাইয়ের চাকরি হয়েছে, সংসার হয়েছে। একদিন সে নিজের পছন্দে একটি সিদ্ধান্ত নিতে চাইল। বড় ভাই বলে বসলেন, ‘তুই আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস, সেটা ভুলে যাস না।’
কথাটা শুনতে কৃতজ্ঞতার দাবি মনে হয়, আসলে ওটা অধিকারের দাবি।
বড় ভাইয়ের ত্যাগ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ছোট ভাইয়ের জীবনে তাঁর অবদানও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই অবদানের কারণে কি ছোট ভাইয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তে বড় ভাইয়ের অনুমতি লাগবে? যে সাহায্য একসময় কাউকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল, সেই সাহায্যই যদি পরে তার পায়ে শিকল হয়ে যায়, তাহলে উপকারের অর্থ কোথায় থাকে?
অহংকার সব সময় নিজের বড়ত্ব ঘোষণা করে আসে না। কখনো আসে উপকারের স্মৃতি নিয়ে, কখনো বয়সের অধিকার নিয়ে, কখনো এমন এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে, যেখানে মানুষটি ধরে নেন—তিনি এত কিছু করেছেন, তাই তাঁর কথার বিরোধিতা করার অধিকার অন্যের নেই।
এ ধরনের অহংকার চেনা কঠিন। কারণ এর পেছনে সত্যিকারের ত্যাগ থাকতে পারে, ভালোবাসাও থাকতে পারে। শুধু সেই ভালোবাসার সঙ্গে কখন যে কর্তৃত্ব মিশে যায়, মানুষটি নিজেও হয়তো টের পান না।
মসজিদে বা মন্দিরে গিয়ে মাথা নত করা সহজ, কিন্তু নিজের ভেতরের অহংকারকে বিসর্জন দেওয়া কঠিন। কথাটা বলার সময় আমরা সাধারণত অন্য কারও মুখ মনে করি। সেই মানুষটির কথা ভাবি, যিনি নিজের ক্ষমতা দেখান, অন্যের কথা শোনেন না, কিংবা সামান্য বিরোধিতাও সহ্য করতে পারেন না।
নিজের মুখটা মনে পড়ে কি?
নিজের ভুলের হিসাব
অন্যের ভুল ধরতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগে না। কিন্তু নিজের ভুলের বেলায় হিসাবটা বদলে যায়।
আমি রেগে গিয়ে খারাপ কথা বলেছি? পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছে। অন্য কেউ একই কাজ করলে বলি, তার ব্যবহার খারাপ।
কাউকে অপেক্ষা করিয়েছি? ব্যস্ত ছিলাম। কেউ আমাকে অপেক্ষা করালে মনে হয়, আমাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
একই আচরণের জন্য নিজের কাছে এক রকম ব্যাখ্যা, অন্যের কাছে আরেক রকম বিচার। এই পার্থক্যটা আমরা সব সময় বুঝতে পারি না। বুঝলেও সহজে মেনে নিতে চাই না।
কারণ নিজের ভুল স্বীকার করা মানে শুধু একটি ঘটনা মেনে নেওয়া নয়। কখনো নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা ভালো ধারণাটাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো। যে মানুষটি নিজেকে ন্যায়পরায়ণ মনে করেন, তাঁকে যখন কেউ অন্যায়ের কথা বলেন, তখন তিনি অভিযোগটা শোনার আগেই নিজের পক্ষে যুক্তি সাজাতে শুরু করেন।
কেউ বললেন, ‘আপনার কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি।’
উত্তরে আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমি তো ওই অর্থে বলিনি।’
কথাটা সত্যি হতে পারে। কিন্তু আমি যে অর্থে বলেছি, অন্য মানুষটি যে কষ্ট পেয়েছেন, তার সবটুকু কি সেই ব্যাখ্যা দিয়ে মুছে যায়?
কখনো নিজের উদ্দেশ্য বোঝানোর চেয়ে অন্যের কষ্টটা শোনা বেশি জরুরি। অথচ আমরা সেটা করতে পারি না। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে গিয়ে মানুষটির কষ্টের কথাই আর শোনা হয় না।
প্রার্থনার বাইরে
বিশ্বাস আমাদের মসজিদে বা মন্দিরে নিয়ে যায়, কিন্তু সেই বিশ্বাস ঘরের দরজা পর্যন্ত আসে কি না, সেটা আমরাই ঠিক করি।
পরিবারের কেউ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে একজন মানুষ বয়স কিংবা অভিজ্ঞতার জোরে নিজের মত চাপিয়ে দিতে পারেন। পরে হয়তো নিজেই ভাবেন, পরিবারের ভালোর জন্যই তো করেছেন।
এই ‘ভালোর জন্য করেছি’ কথাটার আড়ালেও অনেক সময় নিজের ইচ্ছা লুকিয়ে থাকে। আমরা ধরে নিই, অন্যের জন্য কোনটা ভালো, সেটা আমরাই বেশি বুঝি। অন্য মানুষটির ইচ্ছা, অভিজ্ঞতা কিংবা আপত্তির মূল্য তখন কমে যায়।
পরিবারে এমন ঘটনা আরও জটিল। বাইরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে দূরত্ব তৈরি করা যায়। কিন্তু বাবা, মা, ভাই কিংবা জীবনসঙ্গীর সঙ্গে প্রতিদিনের সম্পর্কের মধ্যে সেই দূরত্ব তৈরি করা সহজ নয়। সেখানে একজনের কথা অন্যজনকে দীর্ঘদিন সহ্য করতে হয়। কখনো সম্পর্কের টানেই চুপ থাকতে হয়, কখনো নির্ভরশীলতার কারণে।
যে মানুষটি প্রতিবাদ করতে পারেন না, তাঁর নীরবতাকে আমরা অনেক সময় সম্মতি বলে ধরে নিই। অথচ তিনি হয়তো শুধু সম্পর্কটা ভাঙতে চান না।
আমার কথা সবাই মেনে নিচ্ছেন বলে কি আমি ঠিক? কেউ প্রতিবাদ করছেন না বলে কি আমি তাঁকে কষ্ট দিচ্ছি না?
ক্ষমা চাইলে কি ছোট হওয়া যায়?
অনেক সম্পর্কের মধ্যে এমন কিছু কথা জমে থাকে, যেগুলো খুব সহজেই বলা যেত—‘আমি ভুল করেছি’, ‘তোমার সঙ্গে ওইভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি।’ অথচ কথাগুলো বলা হয় না। কখনো রাগের কারণে, কখনো সংকোচে, কখনো শুধু এই ভেবে যে আগে ক্ষমা চাইলে অন্যজন নিজেকে জয়ী মনে করবেন।
সম্পর্কটা তখন আর ভুলের মধ্যে আটকে থাকে না; আটকে থাকে কে আগে মাথা নত করবে, সেই হিসাবের মধ্যে।
কিন্তু ক্ষমা চাওয়া কি পরাজয়? নিজের ভুল স্বীকার করলে কি এত দিনের সম্মান শেষ হয়ে যায়? নাকি আমরা সম্মান বলতে এমন একটা অবস্থান বুঝি, যেখানে অন্য কেউ আমাদের ভুল ধরিয়ে দিতে পারবেন না?
অহংকার আর আত্মসম্মান এক নয়। নিজের অধিকার রক্ষা করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কিংবা অসম্মানজনক আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অহংকার নয়। সমস্যা তখন, যখন নিজের সম্মান বাঁচানোর নামে অন্যের সম্মান নষ্ট করি। নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিই।
কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে তার কথাটা শোনা যায়। নিজের ভুল বুঝলে স্বীকার করা যায়। কাউকে সাহায্য করলে সেই সাহায্যের বিনিময়ে তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দাবি না করাও যায়।
কাজগুলো শুনতে খুব কঠিন নয়। কঠিন হয় ঠিক তখনই, যখন এগুলো নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হয়।
নিজের কাছেই প্রশ্ন
এই লেখাটা লিখতে গিয়ে আমিও ভাবছিলাম, আমি নিজে শেষ কবে ‘আমি ভুল বলেছি’ কথাটা কোনো দ্বিধা ছাড়া বলতে পেরেছি?
প্রশ্নটার উত্তর দেওয়া যত সহজ মনে হয়, আসলে ততটা সহজ নয়। আমরা অন্যের অহংকার নিয়ে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। নিজের অহংকারের কথা উঠলে একটু থেমে যাই। মনে হয়, আমার তো যুক্তি ছিল, আমারও তো কষ্ট হয়েছিল, আমিও তো অনেক কিছু করেছি।
হয়তো এসব কথার সত্যতা আছে। কিন্তু নিজের কষ্ট সত্যি হলেই অন্যকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার জন্মায় না। নিজের অবদান থাকলেই অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর মালিকানা তৈরি হয় না।
মানুষ নিজের ভুল বুঝেও সব সময় বদলাতে পারে না। কখনো পুরোনো অভ্যাস বাধা দেয়, কখনো সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষমতার অবস্থান ছাড়তে ইচ্ছা করে না। তবু পরিবর্তনের শুরুটা হয়তো তখনই, যখন নিজের পক্ষে যুক্তি সাজানোর আগে একবার অন্যের কথাটা শোনার চেষ্টা করি।
আমরা প্রতিদিন কতভাবে মাথা নত করি, তার হিসাব রাখা সম্ভব। কিন্তু কতবার নিজের অহংকারের কারণে অন্য কাউকে ছোট করেছি, কতবার ভুল বুঝেও স্বীকার করিনি, তার হিসাব কি রাখি?
প্রার্থনার সময় মাথা নত করা যায়। কিন্তু নিজের ভুল মেনে নিয়ে সেই একই বিনয় ধরে রাখা যায় কি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।