গরিব কে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৪ অক্টোবর ২০২৬
রিকশাওয়ালাকে দেখলেই আমরা অনেক সময় ধরে নিই, মানুষটা গরিব।
কেন?
তার পেশা রিকশা চালানো। গায়ে হয়তো পুরোনো একটা শার্ট, পরনে লুঙ্গি। রোদে পুড়ে গায়ের রং কালো হয়ে গেছে। কথা বলে স্থানীয় টানে। হয়তো স্কুলের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি।
ব্যস, আমাদের মাথায় একটা পরিচয় তৈরি হয়ে যায়—“গরিব মানুষ।”
অথচ তার পকেটে মাস শেষে কত টাকা থাকে, তার সংসারে কতজন মানুষ, নিজের রিকশা আছে কি না, দিনে কত ঘণ্টা কাজ করেন, কত টাকা খরচ হয়—এসব জানার প্রয়োজনই আমরা অনেক সময় মনে করি না।
আমরা পেশা দেখে মানুষের আর্থিক অবস্থার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
এটাই আসল সমস্যা।
একজন রিকশাচালকের আয় একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। রিকশা নিজের নাকি ভাড়ার, কোন এলাকায় চালান, দিনে কত ঘণ্টা রাস্তায় থাকেন, কত দিন কাজ করতে পারেন—সবকিছু তার আয়কে প্রভাবিত করে।
তাই শুধু রিকশা চালান বলেই একজন মানুষকে গরিব ধরে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
কিন্তু আমাদের ধারণাটা এত সহজে বদলায় না।
কারণ আমরা শুধু আয় দেখি না। আমরা মানুষের পোশাক দেখি, ভাষা শুনি, পেশা দেখি, চেহারা দেখি। তারপর সবকিছুকে একসঙ্গে মিলিয়ে তার একটা সামাজিক পরিচয় বানিয়ে ফেলি।
পোশাককে সামর্থ্য মনে করি।
ইংরেজি বলাকে যোগ্যতা মনে করি।
ডিগ্রিকে বুদ্ধির মাপকাঠি মনে করি।
আর কায়িক শ্রমকে দারিদ্র্যের পরিচয় বানিয়ে ফেলি।
একদিন অভিক অফিস থেকে ফেরার পথে রিকশায় উঠল।
রিকশাওয়ালা বলল, “স্যার, কোথায় যাবেন?”
অভিক ঠিকানা বলল।
কিছুদূর যাওয়ার পর লোকটি বলল, “স্যার, এই রাস্তা দিয়ে গেলে একটু জ্যাম কম পাবেন।”
অভিক বলল, “এই রাস্তা দিয়ে যাবেন?”
লোকটি হেসে বলল, “হ্যাঁ। এই সময় ওই রাস্তায় গাড়ি বেশি থাকে।”
অভিক একটু অবাক হলো। বলল, “আপনি এই এলাকার রাস্তা ভালো চেনেন?”
লোকটি এবার হেসে বলল, “পনেরো বছর ধরে চালাই। কোন সময় কোন রাস্তায় জ্যাম হয়, একটু তো বুঝি।”
অভিক আর কিছু বলল না।
পনেরো বছর ধরে শহরের রাস্তা চেনা মানুষটাকে এতক্ষণ সে শুধু একজন রিকশাওয়ালা হিসেবেই দেখছিল।
কথা বলতে বলতে আরও জানা গেল, লোকটির দুই ছেলে। বড় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছোট ছেলে কলেজে। রিকশাটা নিজের নয়। প্রতিদিন ভাড়া দিতে হয়। তারপরও ছেলেদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিকের মনে হলো, লোকটির জীবনে শুধু রিকশা নেই।
তার সংসার আছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা আছে। প্রতিদিনের হিসাব আছে। শহরের অসংখ্য রাস্তার অভিজ্ঞতা আছে। হয়তো নিজের জীবনের কিছু স্বপ্নও আছে।
আমরা পেশাটাকে দেখি।
মানুষটাকে দেখি না।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে রিকশাচালক মানেই সচ্ছল। অনেকের আয় অনিয়মিত। কারও রিকশা ভাড়ার। কারও চিকিৎসার খরচ আছে, কারও পরিবারের সদস্য বেশি, কারও আবার দিনের আয় দিয়েই দিনের সংসার চলে।
তাই একজন রিকশাচালকের আর্থিক অবস্থা জানতে হলে তার বাস্তব জীবন দেখতে হবে।
শুধু তার রিকশাটা দেখলে হবে না।
আর এখানেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা অদ্ভুত দিক আছে।
আমরা কাউকে দেখেই তার অর্থনৈতিক অবস্থার একটা ছবি বানিয়ে ফেলি।
রিকশাওয়ালা দেখলে নিচু আয় ধরে নিই।
গৃহশ্রমিক দেখলে অসহায় ধরে নিই।
দিনমজুর দেখলে দরিদ্র ধরে নিই।
অথচ তাদের প্রত্যেকের জীবন আলাদা।
কেউ হয়তো প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ হয়তো টাকা জমাচ্ছেন। কেউ গ্রামের বাড়িতে জমি করেছেন। কেউ সন্তানের পড়াশোনায় খরচ করছেন। কেউ হয়তো ঋণের বোঝায় আছেন।
বাইরে থেকে তাদের জীবন একই রকম মনে হতে পারে। ভেতরের হিসাবটা এক নয়।
আর একজন মানুষের আর্থিক অবস্থা যেমন তার পোশাক দিয়ে বোঝা যায় না, তেমনি তার মর্যাদাও তার পেশা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
সমস্যাটা হয়তো এখানেই—আমরা মানুষের আয় জানার আগেই তার অবস্থান ঠিক করে দিই।
তারপর সেই অবস্থান অনুযায়ী আচরণ করি।
রিকশায় ওঠার সময় ভাড়া নিয়ে দরদাম করি। কখনো পাঁচ-দশ টাকা নিয়ে এমনভাবে কথা বলি, যেন সামনের মানুষটির সময় আর শ্রমের কোনো মূল্য নেই।
অথচ একই পাঁচ-দশ টাকা কোনো রেস্টুরেন্টে সার্ভিস চার্জ হিসেবে দিলে আমরা তেমন প্রশ্ন করি না।
কেন?
কারণ আমাদের চোখে কিছু শ্রমের দাম আছে, কিছু শ্রমের শুধু প্রয়োজন আছে।
রিকশাওয়ালা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। তার কাজ শেষ হয় সেখানে।
কিন্তু মানুষটি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না।
সে বাড়ি ফেরে। সন্তানকে দেখে। বাজার করে। হয়তো নিজের বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কেনে। পরদিন আবার রাস্তায় নামে।
তার জীবনও আমাদের মতোই একটি পূর্ণ জীবন।
শুধু তার কাজটা আমাদের চোখে একটু নিচে।
হয়তো সমস্যাটা “গরিব কে” এই প্রশ্নে নয়।
সমস্যাটা হলো, আমরা কাকে দেখে গরিব বলে সিদ্ধান্ত নিই।
একজন মানুষ কত টাকা আয় করেন, কত সম্পদ আছে, কী পরিমাণ খরচ করেন—এসব না জেনে শুধু পেশা, পোশাক আর ভাষা দেখে তাকে গরিব ভাবা আসলে তার সম্পর্কে নয়, আমাদের নিজেদের ধারণা সম্পর্কে বেশি কিছু বলে।
হয়তো সেদিনই আমাদের ভুলটা ধরা পড়বে, যেদিন রিকশা থেকে নেমে আমরা ভাড়া দেওয়ার সময় শুধু রিকশাটার দিকে নয়, মানুষটার চোখের দিকেও একবার তাকাব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।