নীরব মুহূর্তের বিশ্বাসঘাতকতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ০১, ২০২৬
ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে আছি। রাত নেই, তারাও নেই—শহরের আলো তাদের হারিয়ে দিয়েছে, ঠিক যেমন আমাদের নিজস্ব অনুভূতি হারিয়েছে স্ক্রিনের নীল আলোর জ্বাল। বাতাসে ধুলোর গন্ধ, দূরের গাড়ির হর্ন ভেসে আসছে, মুহূর্তটা নিখুঁত, অথচ আমি তা উপলব্ধি করতে পারছি না। কারণ এই মুহূর্তটি আমার নয়—যতক্ষণ না আমি তা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করে অন্যকে দেখাই।
আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে অভিজ্ঞতার আগে আসে প্রমাণ। বন্ধুর বিয়ে, নদীর পাড়ে বিকেল, বা এক কাপ চা—প্রথম প্রশ্ন আজ হয়: ‘ছবি তুলব?’ জীবন যেন একটি সিনেমার সেট, আর আমরা নিজেদেরই দর্শক। জঁ বোদ্রিয়ারের কথা মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন—মানচিত্র বাস্তব ভূখণ্ডকে ছাপিয়ে যায়। অর্থাৎ, আমরা যে ছবি তুলি বা স্ট্যাটাস দিই, তা প্রকৃত অনুভূতির চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। সূর্যাস্ত এখন ততটা প্রফুল্ল নয়, যতটা প্রফুল্ল সেই সূর্যাস্তের ছবি ইনস্টাগ্রামে কত লাইক পেল তা দেখে।
নকল বা বানোয়াট এখানে সূক্ষ্ম। মুহূর্ত উপভোগের আগে যখন তা ডকুমেন্ট করতে ব্যস্ত হই, আমরা নিজেরাই বিশ্বাসঘাতক হয়ে যাই। বাস্তবকে প্রতিস্থাপন করি তার প্রতিলিপি দিয়ে। সমস্যাটা প্রযুক্তিতে নয়—আমাদের অবচেতন মনে নিহিত। আমরা ভয় পাই, যদি মুহূর্তটি কেউ না দেখে, যদি প্রমাণ না থাকে, তবে কি এটি আদৌ ঘটেছে? সেই অস্তিত্বহীনতার ভয় আমাদের ফোনের দিকে টেনে নেয়।
গত সপ্তাহে এমন একটি মুহূর্ত আমাকে থমকে দিয়েছে। বিকেলে হালকা বৃষ্টি। প্রথমে স্বাভাবিক প্রতিফলন—পকেটের দিকে হাত, ফোন বের করার জন্য। কিন্তু হঠাৎ থেমে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বৃষ্টির শব্দ শুধুই আমার—কেউ জানবে না, কোনো ছবি থাকবে না। আমি পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলাম শুধু বৃষ্টি দেখার জন্য। সেই পাঁচ মিনিট ছিল নিখুঁত নীরব, আর তখনই বুঝলাম—বাস্তব অনুভূতি হলো সেই মুহূর্ত, যা কোনো দর্শক ছাড়াই পূর্ণতা পায়।
ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা থেকে বের হওয়া জটিল নয়; তবে অবচেতনকে সামলাতে হয়। কখনো কখনো শুধু নিজেকে অনুমতি দিতে হয়—মুহূর্তটি নিজের মধ্যে অনুভব করতে।
শেষে আমি আবার ছাদের নীরবতায় ফিরে আসি। কোনো প্রমাণ নেই, ছবি নেই, ক্যাপশন নেই। শুধু আমি আর রাত। পৃথিবী জানে না আমি এখানে আছি, কিন্তু এই মুহূর্তটি সত্যিকারের—কারণ এটি শুধুই আমার, অন্য কারও জন্য নয়। সেই নীরবতাতেই লুকিয়ে আছে আসল অস্তিত্ব।
#নীরব_মুহূর্ত #ডিজিটাল_নীরবতা #জীবনদর্শন #বাস্তবতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।