বিবাহ—সামাজিক চুক্তি, নাকি অপ্রচলিত বিলাসিতা?
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী৷ ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
আমার ছোটবেলায় মা বলতেন,
“বিয়ে হলেই সব ঠিক হয়ে যায়।”
আজকে যখন মা একই কথা বলেন, আমি হাসি। হাসি কারণ জানি, ঠিক আর হয় না। বরং উল্টোটা হয় বেশিরভাগ সময়।
গত সপ্তাহে আমার কাজিন শখর ডিভোর্সের কাগজে সই করেছে। বিয়ের বয়স সাত বছর। ছেলে হয়েছে, কিন্তু দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ ছিল গত তিন বছর। শেখর বলছিল, “ভাই, আমি ভেবেছিলাম বিয়ে করলেই জীবনটা গুছিয়ে যাবে। কিন্তু এটা যেন আরেকটা ফুল-টাইম জব, যার বেতন নেই, প্রমোশন নেই, আর রিজাইন করতেও লোকে বকে।”
আমার বন্ধু রিয়া ত্রিশ ছুঁইছুঁই। ব্যাঙ্কে ভালো পোস্টিং। বাবা-মা বিয়ের জন্য পাগল। কিন্তু রিয়া বলে, “আমার একা থাকতে ভালো লাগে। কারো সঙ্গে রোজ রাতে খাবারের মেনু ঠিক করতে ইচ্ছে করে না।”
আমি জিজ্ঞেস করি,
“তোর একা লাগবে না বুড়ো বয়সে?”
ও হেসে বলে, “বিয়ে করলেও তো একা লাগে। শুধু বিছানায় একটা লোক বেশি থাকে।”
আমি নিজেও একটা অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। ত্রিশ পেরিয়েছি। বিয়ের প্রস্তাব এসেছে অনেক। কয়েকজনকে ভালোও লেগেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পা চলেনি।
কারণটা নিজেও ঠিক বুঝি না। হয়তো ভয়। ভয় যে, যে মানুষটাকে আজ ভালো লাগছে, কাল আর লাগবে না। ভয় যে, আমার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলব। ভয় যে, আমি পারব না রোজ একজনের জন্য নিজেকে বদলাতে।
আমরা আগে শুনতাম,
“বিয়ে না করলে সমাজ মানবে না।”
আজকে সমাজ বলে,
“বিয়ে করলেও তো টিকছে না।”
ডিভোর্স রেট চারিদিকে চোখে পড়ার মতো হয়ে গেছে। আমার অফিসের দশজনের মধ্যে চারজনের বিয়ে ভেঙেছে।
কেউ কেউ আবার দ্বিতীয়বার করেছে, সেটাও ভাঙার পথে। আমরা যেন বিয়েকে একটা ট্রায়াল পিরিয়ড ভাবতে শিখে গেছি। যেমন মোবাইল কিনে দেখি, পছন্দ না হলে রিটার্ন। শুধু এখানে রিটার্ন করতে গেলে একটু বেশি কষ্ট হয়, আর টাকা ফেরত পাওয়া যায় না।
লিভ-টুগেদারও বেড়েছে। অনেকে বলে, এটা স্বাধীনতা। আমার মনে হয়, এটা একটা সুন্দর অজুহাত।
কারণ যারা সত্যি ভালোবাসে, তারা কাগজের একটা সইয়ের জন্য ভয় পায় না। আর যারা ভয় পায়, তারা আসলে বিয়ে করতে চায় না, শুধু সঙ্গ চায়। সঙ্গ আর সম্পর্ক কিন্তু এক জিনিস নয়।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা কি সত্যি বেশি স্বাধীন হয়েছি, নাকি শুধু বেশি ভিতু হয়েছি?
আগে মানুষ একসঙ্গে থাকত বলে থাকতে হতো। এখন থাকতে চাইলেও পারি না, কারণ ছাড়ার রাস্তা খুব সহজ হয়ে গেছে।
আমার বাবা-মা আজও একসঙ্গে আছেন। ঝগড়া হয়, কিন্তু ছাড়াছাড়ি হয় না। কারণ তাঁদের কাছে বিয়ে মানে ছিল “একটা সংসার চালিয়ে যাওয়া”।
আমাদের কাছে বিয়ে মানে “একটা সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া যতক্ষণ ভালো লাগে”।
এইটুকু পার্থক্যই সব ভাঙাচোরা করে দিয়েছে।
তাই আজকে বিয়ে আর বাধ্যতামূলক কিছু নয়। এটা একটা বিকল্প। যেমন কেউ গাড়ি কেনে, কেউ উবারে চড়ে। দুটোই চলে। কেউ কেউ গাড়ি কিনে আবার বেচেও দেয়। কেউ উবারে চড়তে চড়তেই বুড়ো হয়ে যায়। দুটোর কোনোটাই ভুল নয়। শুধু নিজে বুঝতে হবে কোনটা নিজের জন্য ঠিক।
আমি এখনো ঠিক করিনি।
কখনো মনে হয় বিয়ে করব। কখনো মনে হয়, একাই ভালো আছি।
কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত জানি—যে করব,
সেটা আর “সবাই করছে বলে” করব না।
নিজে চাইলে করব। নিজে পারব বলে করব।
আর যদি না পারি, তাহলে একা থাকব।
অন্তত নিজের সঙ্গে তো ডিভোর্স করতে হবে না।
#বিয়ে #একা_থাকা #ডিভোর্স #লিভটুগেদার #মধ্যবিত্তের_সংকট #ভালোবাসা_আজকাল #বাঙালির_বিয়ে #সম্পর্ক_২০২৫ #একবিংশ_শতাব্দীর_প্রেম #আমার_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।