দ্বিতীয় পর্ব (২/২)
বাংলা সাহিত্যে নারী সম্মানিত নাকি নান্দনিকভাবে নিয়ন্ত্রিত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৬, ২০২৬
নারী লেখকরা কীভাবে কাঠামো ভাঙলেন
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন "সুলতানার স্বপ্ন" উপন্যাসে কল্পনায় এমন সমাজ তৈরি করেন যেখানে নারীরা শাসন করেন, পুরুষরা পর্দায় থাকেন। এটি ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সরাসরি সমালোচনা নয়, বরং উল্টো দুনিয়া তৈরি করে চিন্তার বিপ্লব। "পদ্মরাগ" উপন্যাসে তিনি নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন।
অশাপূর্ণা দেবী "প্রথম প্রতিশ্রুতি" উপন্যাসে নারীকে দেখান বাস্তব জীবনের সংগ্রামে। শীতল চরিত্র অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন—তিনি কোনো আদর্শ নারী নন, কিন্তু সত্যিকারের মানুষ।
মহাশ্বেতা দেবী "হাজার চুরাশির মা" উপন্যাসের দ্রৌপদীকে তুলে ধরেন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে। তিনি নকশাল আন্দোলনে অংশ নেন, নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করেন, শরীর ও রাজনীতি নিয়ে প্রতিরোধ করেন। এখানে নারী "সম্মানিত" নন ঐতিহ্যগত অর্থে, কিন্তু সত্যিকারের শক্তিশালী।
তসলিমা নাসরিন "লজ্জা" ও "নির্বাণনদীর উপকূলে" উপন্যাসে নারীর শরীর, ধর্ম ও সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তিনি সমাজের "সম্মান" এর ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন।
পুরুষ লেখকদের মধ্যে ব্যতিক্রম
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় "পদ্মা নদীর মাঝি" উপন্যাসের কিরণময়ীকে দেখান ক্ষুধার্ত, ক্ষুব্ধ, ব্যর্থ—কিন্তু সংগ্রামী। তিনি তার স্বামীকে বলেন, "আমি কি শুধু খেতে বাঁচব, নাকি মানুষ হয়ে বাঁচব?" এই এক লাইনে তার সংগ্রামের সারমর্ম। শ্রেণি-চেতনা তাকে আদর্শায়ন থেকে মুক্ত রাখে। তিনি "সম্মানিত" নন ঐতিহ্যগত অর্থে, কিন্তু সত্যিকারের মানুষ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় "সেই সময়" উপন্যাসের ত্রিলাকে দেখান বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে স্বাধীন—নিজের লেখা, নিজের সম্পর্ক। কিন্তু সমাজ তাকে "শাস্তি" দেয়। এখানে লেখকের দ্বিধা প্রকাশ পায়।
সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক
নির্দিষ্ট ধরনের নারী চরিত্র বারবার উপস্থাপিত হলে তা পাঠকের ধারণাকে গড়ে দেয়। বাংলা সাহিত্যে "ত্যাগী মা" বা "সহনশীল স্ত্রী" এতবার দেখা গেছে যে, বাস্তবেও নারীরা নিজেদের এভাবে গড়তে বাধ্য বোধ করেন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক "নীচু শ্রেণির কণ্স স্বর উঠতে পারে কি?" প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতাহীনরা নিজেদের কথা বলতে পারে না। সাইমন দ্য বোভোয়ার "দ্বিতীয় লিঙ্গ" গ্রন্থে দেখিয়েছেন নারী কীভাবে "অপর" হিসেবে গড়ে ওঠে।
শেষ কথা
বাংলা সাহিত্যে নারী কখনো একরকম ছিল না। অতীতে নান্দনিক নিয়ন্ত্রণ বেশি ছিল, সময়ের সাথে স্বাধীনতার স্বীকৃতি বাড়ছে। সমকালীন লেখকদের মধ্যে চমৎকার আরজ আলী মাতুব্বরের "সত্যের সন্ধানে" বা অনিন্দ্য রচনায় নারীর বহুমাত্রিক উপস্থাপনা দেখা যায়। তবে "সম্মান" ও "স্বাধীনতার" দ্বন্দ্ব এখনো আছে। সত্যিকারের সম্মান তখনই, যখন তার সাথে স্বাধীনতাও থাকে।
আপনার কী মনে হয়? বাংলা সাহিত্যের কোন নারী চরিত্র আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে?
তথ্যসুত্রঃ
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন: "সুলতানার স্বপ্ন" (১৯০৫)
মহাশ্বেতা দেবী: "হাজার চুরাশির মা" (১৯৭৪)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: "পদ্মা নদীর মাঝি" (১৯৩৬)
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: "দেবদাস" (১৯১৭)
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক: "নীচু শ্রেণির কণ্স স্বর উঠতে পারে কি?" (১৯৮৮)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।