রিজিক ও মানবজীবনের ভারসাম্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । মে ১০,২০২৬
রিজিককে সাধারণত আয় বা সম্পদের সমার্থক বলে ধরে নেওয়া হয়, কিন্তু এই সীমিত সংজ্ঞা পুরো বাস্তবতাকে ধরে না। বিশ্বাসের কাঠামোতে এটি জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি বিস্তৃত পরিমাপ—যেখানে মানুষের অস্তিত্ব, সম্পর্ক, এমনকি শেষ পরিণতির দিকেও ইঙ্গিত থাকে বলে মনে করা হয়। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে সব সময় সরলভাবে সমর্থন করে না; বরং এর ভেতরে এক ধরনের জটিলতা থেকে যায়।
ধারণা করা হয়, একজন মানুষের জীবনে নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজিক আগে থেকেই নির্ধারিত। কেউ যদি উদাহরণ হিসেবে এক কোটি টাকার কথা ধরে নেয়, তাহলে সেই সীমার মধ্যেই তার অর্জন আবর্তিত হবে। কিন্তু এই অনুমানের ভেতরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়—এই অর্জনের পথ কি একইভাবে নির্ধারিত, নাকি সেখানে মানুষের সিদ্ধান্ত কাজ করে? প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী ফল স্থির হলেও পথটি মানুষের নৈতিক নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল। হালাল বা হারামের সিদ্ধান্ত তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং দায়িত্বের অংশ হিসেবেও দেখা হয়।
দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ফল, যা বহু দেশ ঘুরে বাজারে আসে, সেটিকে বাইরে থেকে দেখলে অসংখ্য ঘটনাপ্রবাহের সমষ্টি মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসের দৃষ্টিতে সেটি নির্দিষ্ট একজনের প্রাপ্তির অংশ। বাজারের ব্যাগ থেকে ফলটা বের করে ছুরি চালালে যে রস গড়িয়ে পড়ে, সেই মুহূর্তটিও যেন কারও নির্ধারিত অংশের ভেতরেই পড়ে—এই ভাবনাটা অনেক সময় অদ্ভুত এক নীরবতা তৈরি করে। যতক্ষণ না নির্দিষ্ট ব্যক্তি সেটি গ্রহণ করছে, ততক্ষণ সেটি তার জন্য অপেক্ষমান বলেই মনে করা হয়।
এই ব্যাখ্যার ভেতরে আরেকটি ধারণা কাজ করে—মানুষ যা পায়, তা আলাদা কোনো দখল নয়, বরং তার জন্য নির্ধারিত অংশের প্রকাশ। এমনকি অন্যের ঘরে গিয়ে খাবার গ্রহণ করাও এই দৃষ্টিতে ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং নির্ধারিত প্রাপ্তির একটি রূপান্তর মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো মানুষের অহংকার কমায়, আবার কখনো দায়িত্ববোধের সীমা অস্পষ্ট করে তোলে—দুটো দিকই একসঙ্গে উপস্থিত থাকে।
কুরআনের আলোকে কোনো প্রাণীই রিজিকের বাইরে নয়; এটি সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত একটি সার্বিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। পৃথিবীকে এখানে স্থায়ী কোনো গন্তব্য না ভেবে অস্থায়ী একটি পর্যায় হিসেবে ধরা হয়, যেখানে মানুষের অবস্থান সীমিত সময়ের জন্য।
একই সঙ্গে একটি সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়—সব মানুষের রিজিক যদি সমান হতো, তাহলে পারস্পরিক নির্ভরতার কাঠামো ভেঙে পড়তে পারত। মানুষের মধ্যে যে ভিন্নতা, তা কেবল বিভাজন নয়; বরং একে অন্যের উপর নির্ভরশীলতার একটি কাঠামো তৈরি করে। কেউ কাজ করে, কেউ সেবা দেয়, কেউ গ্রহণ করে—এই সম্পর্কের ভেতর দিয়েই সমাজ টিকে থাকে।
তবে রিজিককে কারো চূড়ান্ত মূল্যায়নের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। স্বচ্ছলতা যেমন নিশ্চিতভাবে সাফল্যের প্রমাণ নয়, তেমনি অভাবও ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে না। বরং এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র, যেখানে অবস্থার ওঠানামা মানুষকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলে।
এই পরীক্ষার ভেতরে মানুষের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় নয়। চেষ্টা, নৈতিকতা এবং ধৈর্যের প্রশ্ন এখানে প্রতিনিয়ত ফিরে আসে। দ্রুত সবকিছু পাওয়ার যে প্রবণতা মানুষের মধ্যে থাকে, বাস্তবতা সেটিকে প্রায়ই থামিয়ে দেয়। সময় এগিয়ে চলে নিজের নিয়মে, আর প্রাপ্তি আসে ধীরে।
চরম সত্য হলো, মানুষ তার নির্ধারিত অংশ ছাড়া পৃথিবী ত্যাগ করে না। এই বিশ্বাস অনেককে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখে, আবার কিছু প্রশ্নও অমীমাংসিত রেখে যায়।
সব মিলিয়ে, রিজিকের ধারণা কোনো একরৈখিক ব্যাখ্যা নয়। এটি একদিকে আস্থার জায়গা তৈরি করে, অন্যদিকে মানুষের সিদ্ধান্তের গুরুত্বকেও অস্বীকার করে না। ফল নির্ধারিত হলেও পথের অভিজ্ঞতা অনিশ্চিত থেকে যায়। আর সেই অনিশ্চয়তার ভেতরেই মানুষ নিজের অর্থ খুঁজে ফেরে—হয়তো এই টানাপোড়েনই রিজিকের সবচেয়ে কাছের ভাষা। যা সৃষ্টি কর্তা কর্তৃক নির্ধারিত।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।