এক মুঠো ভাতের কী দাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুপুরের খাওয়া শেষ। টেবিলে একটা প্লেট পড়ে আছে। একপাশে বেশ কিছু ভাত।
“ফেলে দাও।”
এই একটা বাক্য বলে আমরা উঠে যাই। ভাতগুলো ময়লার ঝুড়িতে যায়। দৃশ্যটা এত পরিচিত যে ফেলে দেওয়ার সময় আমরা আর ভাতের দিকে তাকাইও না।
অথচ একই শহরের অন্য গলিতে একজন মা হাঁড়ির তলা থেকে লেগে থাকা ভাতটুকু চামচ দিয়ে তুলে ছেলের পাতে দিচ্ছেন। ছেলেটা বলছে, “মা, আর একটু দাও।” মা বলছেন, “এইটুকুই আছে বাবা।”
দুই বাড়িতেই ভাত আছে। শুধু তার মূল্য এক নয়। আমাদের আলোচনাটা এই মূল্যের পার্থক্য নিয়েই।
১. ভাতের দুটো দাম আছে
আমরা ভাতের বাজারদর জানি। চালের কেজি কত বাড়ল, সেই হিসাব রাখি। কিন্তু ভাতের আরেকটা দাম আছে, যেটা টাকায় হয় না।
এক মুঠো ভাত পাতে আসার আগে একটা দীর্ঘ শেকল পেরিয়ে আসে। কাদায় নেমে চারা লাগানো, রোদে দাঁড়িয়ে থাকা, ধান কাটা, বয়ে নেওয়া, মাড়াই, চালকল, বাজার, তারপর রান্নাঘর। সকালে আরেকজন মানুষ চাল ধুয়ে চুলা জ্বালান। এই পুরো শ্রমটা আমরা প্লেটে থাকা অবস্থায় ভুলে যাই।
যখন খাবার সহজলভ্য হয়, তখন আমরা তাকে আর খাবার হিসেবে দেখি না। তাকে আয়োজনের অংশ হিসেবে দেখি। তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিই, রেখে দিই। বিয়ে বাড়িতে হাঁড়ি ভর্তি খাবার থেকে যায়, আমরা বলি “একটু বেশিই তো লাগে।”
অন্যদিকে যে পরিবারে মাসের শেষে টান পড়ে, সেখানে এক কেজি চালের হিসাব হয় দিনে। মা রান্না করার আগে গুনে নেন আজ কয়জন খাবে। সেখানে ভাত কোনো আয়োজন নয়, সেখানে ভাত হলো নিরাপত্তা।
এই দুই দেখার পার্থক্যটাই আসল বৈষম্য।
২. ক্ষুধা কোনো ছবি নয়
আমরা ক্ষুধার ছবি দেখি — পত্রিকায়, মোবাইলের স্ক্রিনে, ত্রাণের লাইনে। কিছুক্ষণ খারাপ লাগে, তারপর স্ক্রল করে চলে যাই।
কিন্তু যার ঘরে ভাত নেই, তার কাছে ক্ষুধা কোনো ছবি নয়। ক্ষুধা একটা দীর্ঘ রাত।
সবচেয়ে কষ্টের দৃশ্যটা তখন, যখন একজন বাবা নিজের পাতের ভাত সন্তানের দিকে ঠেলে দিয়ে বলেন, “খেয়েছি।” হয়তো তিনি খাননি। দারিদ্র্য শুধু কম খেতে শেখায় না, নিজের ক্ষুধাটা লুকাতেও শেখায়।
এই কারণে খাবারের অপচয়কে শুধু “অপচয়” বললে ছোট করা হয়। একজনের পাতে পড়ে থাকা ভাত আর আরেকজনের খালি পেট — এই দুটোকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, এটা শুধু খাবারের সংকট নয়, এটা বণ্টনের সংকট।
৩. সমস্যাটা শুধু পাতে নয়, শেকলে
এখানেই বিশ্লেষণের জায়গা। শুধু “পাতে ভাত নষ্ট করবেন না” বললে সমস্যা মিটবে না। প্রশ্ন করতে হবে আরও গভীরে।
একজন শ্রমিক সারাদিন কাজ করেও কেন রাতে নিশ্চিত হতে পারেন না যে ঘরে ভাত থাকবে? একজন রিকশাচালক কেন ভাবেন, আজ মাছ বাদ দিলে চালটা বেশি কেনা যাবে? যে কৃষক ধান ফলালেন, তিনি কেন নিজের ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন?
যিনি ফলান, তিনি দাম পান না। যিনি কেনেন, তার কাছে দাম বেশি। মাঝখানে এই ফারাকটা কেন তৈরি হয়? এই ফারাকটাই একজন মানুষের সারাদিনের মজুরিকে অনিশ্চিত করে দেয়।
তাই একবেলা খাবার দিয়ে ক্ষুধা থামানো যায়, কিন্তু ক্ষুধার কারণটা থামে না। কারণটা রান্নাঘরে নেই, কারণটা আছে বাজারের ব্যবস্থাপনায়, কৃষকের প্রাপ্যতে, শ্রমিকের মজুরির নিরাপত্তায়।
শেষ কথা
দিন শেষে আমরা সবাই ভাত খাই। কারও পাতে পাঁচ পদ থাকে, কারও পাতে শুধু ডাল। ভাত একই থাকে, কিন্তু সবার কাছে তার মানে এক থাকে না।
তাই পাতে এক মুঠো ভাত পড়ে থাকলে ফেলে দেওয়ার আগে একবার তাকানো যায়। সেখানে শুধু ভাত পড়ে নেই, সেখানে একজন কৃষকের ঘাম, একজন মায়ের সকাল আর একজন শ্রমিকের সারাদিনের হিসাব পড়ে আছে।
আর হয়তো দূরের কোনো ঘরে এখনো একটা শিশু বলছে, “মা, আর একটু ভাত দাও।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।