মানুষের চেয়ে হিংস্র প্রাণী হতে পারে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬
আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন—একটা বাঘ শিকার করে ক্ষুধায়, কিন্তু মানুষ হত্যা করে যুক্তি বানিয়ে?
প্রাণীদের হিংস্র বলি আমরা। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে প্রশ্ন জাগে—হিংস্রতার সংজ্ঞা কি শুধু দাঁত-নখে সীমাবদ্ধ?
নাকি পরিকল্পনা, অজুহাত আর নৈতিকতার মুখোশ পরে যে সহিংসতা ঘটে, সেটাই আসল হিংস্রতা?
একটা সিংহ শিকার করে কারণ সে না করলে বাঁচবে না। সে আনন্দ পায় না শিকারের আর্তনাদে। সে ইতিহাস লেখে না নিজের হত্যাকে যুক্তি দিতে। কিন্তু মানুষ? মানুষ পারে।
মানুষই একমাত্র প্রাণী যে হত্যা করার আগে ব্যাখ্যা বানায়, পরে উৎসব করে।
মানুষের হিংস্রতা তাৎক্ষণিক নয়—এটা ধীর, ঠান্ডা, কৌশলী। এখানে রাগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো হিসাব। কে দুর্বল, কে কম প্রতিবাদ করবে, কাকে মারলে সমাজ মেনে নেবে—এই অঙ্ক মানুষই কষে।
প্রাণীরা হত্যা করে প্রয়োজন থেকে। মানুষ হত্যা করে পরিচয় থেকে—ধর্ম, জাত, ক্ষমতা, লিঙ্গ, মতাদর্শ। এই পরিচয়গুলোই মানুষকে শেখায়, “ও মানুষ না, ও শত্রু।”
একটা কুকুর কখনো দল বেঁধে আরেকটা কুকুরকে পুড়িয়ে মারে না শুধু আলাদা রঙের লোমের জন্য। একটা নেকড়ে কখনো সভা করে সিদ্ধান্ত নেয় না—আজ আমরা দুর্বলদের নিশ্চিহ্ন করব। মানুষই সভা করে। মানুষই সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষই পরে বলে—“পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল।”
আমরা হিংস্রতাকে এত নিখুঁতভাবে সাজাই যে সেটাকে হিংস্রতাই মনে হয় না।
রাষ্ট্রের নামে যুদ্ধ হয়। ধর্মের নামে হত্যা হয়। সম্মানের নামে নারী মারা যায়। উন্নয়নের নামে মানুষ উচ্ছেদ হয়। প্রতিবারই একটা সুন্দর শব্দ দাঁড় করানো হয় রক্তের সামনে—যেন রক্তটা দেখা না যায়।
এটাই মানুষের ভয়ংকর দিক।
কারণ মানুষ শুধু আঘাত করে না—সে আঘাতকে নৈতিকতা শেখায়।
শিশু যখন প্রথমবার কাউকে ঘৃণা করতে শেখে, সে নিজে শেখে না। তাকে শেখানো হয়। পরিবার, সমাজ, পাঠ্যবই, বক্তৃতা—সব মিলে তাকে বোঝানো হয়, “এরা আমাদের মতো না।” এখান থেকেই হিংস্রতার বীজ রোপণ হয়।
প্রাণীরা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে হত্যা শেখায় না। মানুষ শেখায়।
আরও ভয়ংকর বিষয় কী জানেন?
মানুষ হিংস্র হয়েও নিজেকে শান্তিপ্রিয় দাবি করতে পারে।
সে বলে, “আমি তো খারাপ মানুষ না।”
সে বলে, “আমি বাধ্য ছিলাম।”
সে বলে, “সবাই এটাই করে।”
এই আত্মপ্রবঞ্চনাই মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
একটা বাঘ কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ ভাবার চেষ্টা করে না। মানুষ করে। দিনের পর দিন। বছরের পর বছর।
আমরা যখন বলি “মানুষের মতো মানুষ হও”—তখন আসলে আমরা স্বীকার করি, মানুষ হওয়াটাই সহজ নয়। কারণ মানুষ হওয়া মানে শুধু বুদ্ধিমান হওয়া না; মানুষ হওয়া মানে সহানুভূতি রাখা। আর সহানুভূতি মানুষই সবচেয়ে বেশি বিসর্জন দেয়।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো ভাইরাস না, কোনো বন্য প্রাণী না। সবচেয়ে বড় হুমকি সেই মানুষ, যে নিজেকে ন্যায্য মনে করে।
যে বিশ্বাস করে—তার রাগ পবিত্র, তার সহিংসতা প্রয়োজনীয়, তার ঘৃণা যৌক্তিক।
এই বিশ্বাস থেকেই গণহত্যা জন্ম নেয়। এই বিশ্বাস থেকেই লিঞ্চিং, দাঙ্গা, নিপীড়ন জন্ম নেয়। এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ আরেক মানুষের চোখে মানুষ থাকে না।
প্রাণীরা সীমা জানে। মানুষ সীমা ভাঙাকে গৌরব বানায়।
তাই যদি প্রশ্ন করা হয়—মানুষের চেয়ে হিংস্র প্রাণী আছে কি?
উত্তরটা অস্বস্তিকর, কিন্তু সৎ—না। নেই।
কারণ মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে হিংস্রতা করতে করতে সেটাকে সভ্যতা বলে ডাকতে পারে।
এই লেখা কাউকে ঘৃণা শেখানোর জন্য না। এই লেখা আয়না দেখানোর জন্য।
কারণ আমরা যদি এই আয়নায় তাকাতে না পারি, তাহলে আমাদের “সভ্যতা” শব্দটা শুধু শব্দই থেকে যাবে।
এই লেখাটা পড়তে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও আপনি অস্বস্তি অনুভব করে তাহলে ভাববেন এই অস্বস্তিই প্রথম ধাপ, মানুষ হয়ে ওঠার।
#মানুষেরহিংস্রতা #নীরবসহিংসতা
#সমাজমনস্তত্ত্ব #মানবিকতারআয়না #বিশ্লেষণধর্মী
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।