চিকিৎসা যখন সামর্থ্যের পরীক্ষা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ১৯ আগষ্ট, ২০২৬
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের দেশে অসুস্থ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়। বিপদটা শুরু হয় হাসপাতালের কাউন্টার থেকে—যখন বলা হয়, “এই পরীক্ষাগুলো করতে হবে।”
তখন রোগীর স্বজন শুধু রোগীর মুখের দিকে তাকান না। নিজের পকেটের দিকেও তাকান। হাতে কত আছে, বাসায় কত রাখা আছে, কার কাছ থেকে ধার করা যাবে, কোন খরচটা কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া যায়—হিসাব শুরু হয়ে যায় তখনই।
একটা চিকিৎসার কাগজ হাতে নিয়ে ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ অনেকবার দেখেছি। ওষুধগুলো একে একে কাউন্টারে রাখা হয়। শেষে মোট টাকার অঙ্কটা শুনে মানুষটা একটু থেমে যান। তারপর দু-একটা ওষুধের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলেন, “এগুলো কি আজ না নিলেও হবে?”
প্রশ্নটা খুব ছোট। কিন্তু এর ভেতরে একটা সংসারের অসহায়ত্ব লুকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশে চিকিৎসার বড় একটি অংশের খরচ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। ফলে অসুস্থতা শুধু শরীরের ওপর চাপ ফেলে না, পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাবও বদলে দেয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই চাপ অনেক সময় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
একটা পরিবার হয়তো কোনোভাবে মাস চালিয়ে নেয়। সন্তানের পড়াশোনা আছে, বাড়িভাড়া আছে, বাজারের খরচ আছে। মাস শেষে হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। এর মধ্যে পরিবারের একজনের নিয়মিত চিকিৎসা শুরু হলো।
প্রথম মাসে সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা গেল।
পরের মাসে আবার সঞ্চয় ভাঙতে হলো।
তারপর হয়তো আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার।
এরপর ধার শোধ করার চিন্তা।
এভাবে একসময় দেখা যায়, রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি পুরো পরিবারই আর্থিক চাপের মধ্যে ঢুকে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় বিষয়টি আরও কঠিন। হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি রোগ কিংবা অন্য কোনো জটিল রোগে চিকিৎসা একদিনে শেষ হয় না। বারবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। আজকের খরচ কোনোভাবে ম্যানেজ করা গেলেও আগামী মাসের চিন্তা থেকে যায়।
আর চিকিৎসার খরচ শুধু হাসপাতালের বিল নয়। রোগীকে নিয়ে যাতায়াত, সঙ্গে থাকা মানুষের খরচ, কাজ বন্ধ থাকার কারণে আয় কমে যাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে চাপটা আরও বাড়ে।
একজন দিনমজুর কয়েক দিন কাজ করতে না পারলে সেই দিনের আয় হারান। ছোট ব্যবসায়ী চিকিৎসার জন্য দোকানে বসতে না পারলে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাকরিজীবীর ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
অসুখ তখন আর শুধু একজন মানুষের থাকে না। তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
এর সঙ্গে আছে আরেকটি বড় সমস্যা—চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সীমিত জ্ঞান।
কোন পরীক্ষা কেন করা হচ্ছে, কোনটি এখন জরুরি, কোনটি পরে করলেও চলবে—এসব একজন রোগীর পক্ষে বোঝা সহজ নয়। তিনি চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাস করেই এগিয়ে যান।
এই জায়গায় স্বচ্ছতা খুব দরকার।
কোনো পরীক্ষা দেওয়ার আগে রোগীকে যদি সহজ ভাষায় বলা হয় কেন পরীক্ষাটি প্রয়োজন, ফলাফল চিকিৎসার সিদ্ধান্তে কীভাবে কাজে লাগবে এবং আনুমানিক কত খরচ হতে পারে, তাহলে রোগী অন্তত নিজের অবস্থাটা বুঝতে পারেন।
কিন্তু পরীক্ষার নাম, ওষুধের তালিকা আর বিলের অঙ্ক একসঙ্গে সামনে এলে অনেক পরিবারই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তখন চিকিৎসার পাশাপাশি শুরু হয় আরেক ধরনের অনিশ্চয়তা—কোনটা করব, কোনটা বাদ দেব?
এখানে চিকিৎসকদের সবাইকে দায়ী করা ঠিক হবে না। আমাদের দেশে অসংখ্য চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আন্তরিকভাবে মানুষের সেবা করছেন। সমস্যাটা শুধু ব্যক্তির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামো।
হাসপাতাল পরিচালনা করতে খরচ আছে। চিকিৎসা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনবল—সবকিছুরই মূল্য আছে। চিকিৎসাও একটি পেশা। কিন্তু রোগীর বাস্তবতাটাও ভুলে গেলে চলবে না।
তারও সীমিত আয় আছে। সংসার আছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে। মাসের শেষে বাড়িভাড়া দেওয়ার দায় আছে।
একজন মানুষ হাসপাতালে গেলে তাকে শুধু একজন সেবাগ্রহীতা হিসেবে দেখলে হবে না। তিনি বিপদের সময় সাহায্য চাইতে এসেছেন।
তাই চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে রোগীকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার ধারণা দেওয়া দরকার। কোন পরীক্ষা কেন, কোন চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী—এসব বোঝানোর পাশাপাশি আর্থিক দিকটাও আলোচনায় থাকা উচিত।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে কম নয়।
সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, জরুরি চিকিৎসা আরও সহজলভ্য করা, সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করা—এসব এখন আর বিলাসী চিন্তা নয়। প্রয়োজন।
কারণ একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়া উচিত—কোন চিকিৎসা তার জন্য ভালো।
“টাকাটা কোথা থেকে জোগাড় করব?”—এই প্রশ্নটা নয়।
আমরা প্রায়ই বলি, মানুষের জীবন অমূল্য।
কথাটা সত্যি। কিন্তু সেই অমূল্য জীবনের চিকিৎসার সামনে যদি সামর্থ্যের দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
কারণ অসুস্থ হওয়া মানুষের হাতে থাকে না। কিন্তু অসুস্থতার কারণে একটি পরিবার কতটা ভেঙে পড়বে—সেটা অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করেছি তার ওপর।
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ১৯ আগষ্ট, ২০২৬
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের দেশে অসুস্থ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়। বিপদটা শুরু হয় হাসপাতালের কাউন্টার থেকে—যখন বলা হয়, “এই পরীক্ষাগুলো করতে হবে।”
তখন রোগীর স্বজন শুধু রোগীর মুখের দিকে তাকান না। নিজের পকেটের দিকেও তাকান। হাতে কত আছে, বাসায় কত রাখা আছে, কার কাছ থেকে ধার করা যাবে, কোন খরচটা কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া যায়—হিসাব শুরু হয়ে যায় তখনই।
একটা চিকিৎসার কাগজ হাতে নিয়ে ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ অনেকবার দেখেছি। ওষুধগুলো একে একে কাউন্টারে রাখা হয়। শেষে মোট টাকার অঙ্কটা শুনে মানুষটা একটু থেমে যান। তারপর দু-একটা ওষুধের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলেন, “এগুলো কি আজ না নিলেও হবে?”
প্রশ্নটা খুব ছোট। কিন্তু এর ভেতরে একটা সংসারের অসহায়ত্ব লুকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশে চিকিৎসার বড় একটি অংশের খরচ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। ফলে অসুস্থতা শুধু শরীরের ওপর চাপ ফেলে না, পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাবও বদলে দেয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই চাপ অনেক সময় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
একটা পরিবার হয়তো কোনোভাবে মাস চালিয়ে নেয়। সন্তানের পড়াশোনা আছে, বাড়িভাড়া আছে, বাজারের খরচ আছে। মাস শেষে হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। এর মধ্যে পরিবারের একজনের নিয়মিত চিকিৎসা শুরু হলো।
প্রথম মাসে সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা গেল।
পরের মাসে আবার সঞ্চয় ভাঙতে হলো।
তারপর হয়তো আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার।
এরপর ধার শোধ করার চিন্তা।
এভাবে একসময় দেখা যায়, রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি পুরো পরিবারই আর্থিক চাপের মধ্যে ঢুকে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় বিষয়টি আরও কঠিন। হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি রোগ কিংবা অন্য কোনো জটিল রোগে চিকিৎসা একদিনে শেষ হয় না। বারবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। আজকের খরচ কোনোভাবে ম্যানেজ করা গেলেও আগামী মাসের চিন্তা থেকে যায়।
আর চিকিৎসার খরচ শুধু হাসপাতালের বিল নয়। রোগীকে নিয়ে যাতায়াত, সঙ্গে থাকা মানুষের খরচ, কাজ বন্ধ থাকার কারণে আয় কমে যাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে চাপটা আরও বাড়ে।
একজন দিনমজুর কয়েক দিন কাজ করতে না পারলে সেই দিনের আয় হারান। ছোট ব্যবসায়ী চিকিৎসার জন্য দোকানে বসতে না পারলে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাকরিজীবীর ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
অসুখ তখন আর শুধু একজন মানুষের থাকে না। তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
এর সঙ্গে আছে আরেকটি বড় সমস্যা—চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সীমিত জ্ঞান।
কোন পরীক্ষা কেন করা হচ্ছে, কোনটি এখন জরুরি, কোনটি পরে করলেও চলবে—এসব একজন রোগীর পক্ষে বোঝা সহজ নয়। তিনি চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাস করেই এগিয়ে যান।
এই জায়গায় স্বচ্ছতা খুব দরকার।
কোনো পরীক্ষা দেওয়ার আগে রোগীকে যদি সহজ ভাষায় বলা হয় কেন পরীক্ষাটি প্রয়োজন, ফলাফল চিকিৎসার সিদ্ধান্তে কীভাবে কাজে লাগবে এবং আনুমানিক কত খরচ হতে পারে, তাহলে রোগী অন্তত নিজের অবস্থাটা বুঝতে পারেন।
কিন্তু পরীক্ষার নাম, ওষুধের তালিকা আর বিলের অঙ্ক একসঙ্গে সামনে এলে অনেক পরিবারই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তখন চিকিৎসার পাশাপাশি শুরু হয় আরেক ধরনের অনিশ্চয়তা—কোনটা করব, কোনটা বাদ দেব?
এখানে চিকিৎসকদের সবাইকে দায়ী করা ঠিক হবে না। আমাদের দেশে অসংখ্য চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আন্তরিকভাবে মানুষের সেবা করছেন। সমস্যাটা শুধু ব্যক্তির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামো।
হাসপাতাল পরিচালনা করতে খরচ আছে। চিকিৎসা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনবল—সবকিছুরই মূল্য আছে। চিকিৎসাও একটি পেশা। কিন্তু রোগীর বাস্তবতাটাও ভুলে গেলে চলবে না।
তারও সীমিত আয় আছে। সংসার আছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে। মাসের শেষে বাড়িভাড়া দেওয়ার দায় আছে।
একজন মানুষ হাসপাতালে গেলে তাকে শুধু একজন সেবাগ্রহীতা হিসেবে দেখলে হবে না। তিনি বিপদের সময় সাহায্য চাইতে এসেছেন।
তাই চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে রোগীকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার ধারণা দেওয়া দরকার। কোন পরীক্ষা কেন, কোন চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী—এসব বোঝানোর পাশাপাশি আর্থিক দিকটাও আলোচনায় থাকা উচিত।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে কম নয়।
সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, জরুরি চিকিৎসা আরও সহজলভ্য করা, সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করা—এসব এখন আর বিলাসী চিন্তা নয়। প্রয়োজন।
কারণ একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়া উচিত—কোন চিকিৎসা তার জন্য ভালো।
“টাকাটা কোথা থেকে জোগাড় করব?”—এই প্রশ্নটা নয়।
আমরা প্রায়ই বলি, মানুষের জীবন অমূল্য।
কথাটা সত্যি। কিন্তু সেই অমূল্য জীবনের চিকিৎসার সামনে যদি সামর্থ্যের দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
কারণ অসুস্থ হওয়া মানুষের হাতে থাকে না। কিন্তু অসুস্থতার কারণে একটি পরিবার কতটা ভেঙে পড়বে—সেটা অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করেছি তার ওপর।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।