যখন কষ্টের নাম জানা হয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলম | ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ফোন বাজল। বন্ধুর কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “আজ ট্রিগার্ড ছিলাম।”
আমি চুপ করে রইলাম। বুক হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। হালকা ঘাম হাতের পলকে।
ছোটবেলায় আমরা বলতাম—মন খারাপ। দাদা বলতেন—বিষণ্ণতা। এখন শব্দগুলো বড়, অনুভূতি ছোট। ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি।
গতকাল রাতের কথা মনে পড়ল। আমি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চিঠি পড়ছিলাম। পাশের ঘরে ছেলে তার নীল খেলনা গাড়ি উল্টাপাল্টা করছে। সে হেসে চিৎকার করছে। আমি চোখ ঘোরাচ্ছি স্ক্রিনের দিকে।
স্ত্রীর চোখ—হলুদ আলোয় হালকা ফোলা—জিজ্ঞেস করছে, “আজ কত?”
আমি শুধু মাথা নাড়ি। শব্দ আছে, কিন্তু সংযোগ নেই।
ফ্রিল্যান্সিং জীবনের বিভাজন। শারীরিকভাবে ঢাকায়, আর্থিকভাবে সিডনিতে।
গুগল সার্চ, ক্লায়েন্ট মেসেজ, থ্রেডিং রিপোর্ট—সবকিছু চোখের সামনে।
হাত কাঁপছে, চোখ ঝাপসা। মন কোথায়? জানি না।
বন্ধু ফোন করেছে। বলল, “প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “কী লক্ষণ?”
সে কণ্ঠে হেসে কাঁপা হয়ে বলল, “না, মনে হচ্ছে পরীক্ষা ভালো হবে না।”
শব্দ বড়, কষ্ট ছোট। সে ভুল শব্দ ব্যবহার করছে, কিন্তু অনুভূতি খালি নয়।
মানুষ আজ নিজের কষ্টকে বাইরের চোখে দেখছে। ফ্যাটিগড, বার্নড আউট, ট্রিগার্ড। কেউ কি এভাবে নিজেকে দেখবে? নাকি কষ্ট পাবে, কাঁদবে, রাগ করবে—নাম না জেনে?
একটি গল্পে চরিত্রটি থেরাপিস্টের কাছে যায়। বলে, “আজ ট্রমার সঙ্গে কনফ্রন্ট করলাম।”
পড়ে মনে হলো—নোটবুকের এন্ট্রি। মানবিক নয়।
আমরা ভুলে যাচ্ছি—কষ্ট বোঝার আগে, কষ্ট বাঁচা জরুরি। চোখের চোখে দেখা। নিঃশ্বাসের তলে অনুভব করা।
সারাদিন, অফিসের ল্যাপটপ খোলা। মেল আসে—“জরুরি” লেবেল।
বুক ধড়ফড় করছে। হাত অস্থির। পাশের ছেলে খেলছে, গাড়ি উল্টাপাল্টা করছে।
আমি কিছু করার চেষ্টা করি। গাড়ি হাতে নিই, উল্টাপাল্টা করি। সে হেসে চিৎকার করে।
এক মুহূর্ত মনে হলো—মন পড়ল স্ক্রিনে। ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।
সে হাসছে, আমি তার পাশে বসে আছি, কিন্তু মন কতদূর—জানি না।
রাত। ফ্ল্যাট নিঃশব্দ নয়। নীল আলো জ্বলছে।
বুক ধড়ফড় করছে। হাত ঠান্ডা। ঘুম আসে না। ছেলে গভীর নিদ্রায়।
স্ত্রীর চোখে প্রশ্ন—“আজ কত?”
আমার উত্তর নেই। সব কথোপকথন, মেসেজ, ডেডলাইন—নিজের জন্য কিছু নেই।
ভেতরে—শুধুই শূন্যতা।
সকালে আবার মনে পড়ে। ছেলের গাড়িটি নিয়ে বসি। এক চাকা ভাঙা, তবু চলে।
পাশের মেয়েটি কলম ঘোরাচ্ছে। রোদ ঢুকছে। ভাঙা, কিন্তু চলছে।
আমি স্ক্রিনে মন পড়ে যাবার আগেও কিছুটা ধীরে ধীরে খুঁজে পাই—সংযোগ, ছোট, সত্যিকারের, অসম্পূর্ণ।
শূন্যতা কখনও পুরোপুরি জয় করে না। ব্যর্থতা আছে, অসম্পূর্ণতা আছে। তবু কিছু মুহূর্তে, ভাঙা হলেও, আমরা বাঁচি।
#মানসিকস্বাস্থ্য #কষ্টবাঁচা #শব্দনয়অনুভূতি #ভাঙাকিন্তুচলছে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।