সীমাবদ্ধতা নয়, ভিত্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৪ আগষ্ট, ২০২৬
তৎকালীন সাহিত্যের সীমাবদ্ধতাই কি আজকের সাহিত্যের শক্তি?
তৎকালীন বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদল বলেন, সেই সময়ের সাহিত্যেই ছিল ভাষার সৌন্দর্য, ভাবের গভীরতা ও শিল্পের প্রকৃত মর্যাদা; আজকের লেখালেখি তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।
অন্যদিকে আরেকদল মনে করেন, সেই সাহিত্য মূলত শিক্ষিত ভদ্রসমাজের অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজের বিশাল একটি অংশ—শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা নারীর নিজস্ব কণ্ঠ—সেখানে খুব কমই জায়গা পেয়েছে।
দুটি মতের মধ্যেই সত্যের অংশ আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা প্রায়ই প্রশ্নটি ভুলভাবে করি।
যেগুলোকে আজ আমরা সীমাবদ্ধতা বলে চিহ্নিত করি, সেগুলোই কি পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের নতুন সম্ভাবনার ভিত্তি হয়ে ওঠেনি?
"সীমাবদ্ধতা" শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে হয় ঘাটতি, অপূর্ণতা কিংবা ব্যর্থতার কথা। অথচ সাহিত্য কখনো শূন্যে জন্ম নেয় না। প্রতিটি সাহিত্য তার সময়, সমাজ ও ইতিহাসের সন্তান।
যে সমাজে শিক্ষার সুযোগ সীমিত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস প্রবল, সেই সমাজের সাহিত্যও স্বাভাবিকভাবেই সেই বাস্তবতার ছাপ বহন করবে।
তৎকালীন অধিকাংশ লেখক ছিলেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা ভদ্রসমাজের মানুষ। তাঁরা যে জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন, সেটিই বেশি করে লিখেছেন। ফলে কৃষকের জীবন, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা কিংবা নারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যজগতে পর্যাপ্ত স্থান পায়নি।
আজকের দৃষ্টিতে এটি অবশ্যই একটি সীমাবদ্ধতা। তবে সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধু এই সীমাবদ্ধতার জন্য পুরো সাহিত্যকে অস্বীকার করাও ন্যায্য হবে না।
ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আজকের পাঠকের কাছে সেই সময়ের অনেক গদ্য ভারী বা সংস্কৃতনির্ভর বলে মনে হতে পারে। কোথাও কোথাও ভাষা এমন আনুষ্ঠানিক যে পাঠকের সঙ্গে একটি দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু সেই ভাষাই বাংলা গদ্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছিল। বাক্য নির্মাণ, ভাবের বিন্যাস, যুক্তির শৃঙ্খলা এবং গদ্যের সৌন্দর্য—এসবের যে পরিমিত রূপ আমরা পরে দেখি, তার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল তখনই।
পরবর্তী প্রজন্ম সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভাষাকে সহজ করেছে, কথ্য রূপ দিয়েছে, প্রয়োজন হলে নিয়ম ভেঙেছে। কিন্তু ভাঙার আগে গড়ে ওঠা জরুরি। সেই গড়ে তোলার কাজটি তৎকালীন সাহিত্যই করেছিল।
বিষয়বস্তুর দিক থেকেও একই ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। প্রেম, পরিবার, নৈতিক সংকট কিংবা ব্যক্তিমানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল সাহিত্যের প্রধান বিষয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মমতা কিংবা সামাজিক বৈষম্য সব সময় সরাসরি উচ্চারিত হয়নি। অনেক কথা এসেছে ইঙ্গিতে, রূপকে কিংবা প্রতীকের আড়ালে।
এটিকে কেউ সীমাবদ্ধতা বলতে পারেন। আবার এটিও সত্য, সেই প্রতীকী প্রকাশভঙ্গিই পরে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হয়ে ওঠে। অনেক সময় যা সরাসরি বলা যায় না, সাহিত্য তা ইঙ্গিতেই সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ করে।
আমার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—সমালোচনার ভূমিকা। তৎকালীন সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল বলেই নতুন ধারার জন্ম হয়েছে। নারীবাদী সাহিত্য এসেছে, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পেয়েছে, আঞ্চলিক ভাষা সাহিত্যে প্রবেশ করেছে, নতুন বিষয় ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অর্থাৎ আগের সময়ের অসম্পূর্ণতাই পরের সময়ের পরিবর্তনের প্রেরণা হয়েছে।
তবে এখানেই আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা কি সত্যিই সব সীমা অতিক্রম করতে পেরেছি?
আজও কি সাহিত্যে সব কণ্ঠ সমান গুরুত্ব পায়?
গ্রাম কি শহরের মতোই উপস্থিত?
শ্রমজীবী মানুষের জীবন কি এখনও প্রান্তে রয়ে যায় না? মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞতাকেই কি আমরা এখনও "সাধারণ মানুষের জীবন" বলে ধরে নিই না?
ভাষা কি সত্যিই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পুরোপুরি ইতিবাচক নয়।
তাই তৎকালীন বাংলা সাহিত্যকে আমি না অন্ধ শ্রদ্ধার আসনে বসাতে চাই, না সহজে বাতিল করতে চাই। আমার কাছে সেটি একটি অপরিহার্য অধ্যায়—যেখানে সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে ছিল।
সাহিত্য কখনো স্থির নয়। এক সময় যা প্রতিষ্ঠিত সত্য, পরবর্তী সময়ে সেটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আবার সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় নতুন সাহিত্য, নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এই নিরন্তর ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়েই সাহিত্য নিজের প্রাণশক্তি ধরে রাখে।
তাই আমার কাছে তৎকালীন সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা কেবল ঘাটতির ইতিহাস নয়; বরং তা সম্ভাবনারও ইতিহাস। অনেক প্রশ্ন সে সময় উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু নীরবে থেকে গেছে। পরবর্তী প্রজন্ম সেই নীরব প্রশ্নগুলোকেই ভাষা দিয়েছে, বিস্তার দিয়েছে এবং সাহিত্যের পরিসর আরও বড় করেছে।
সম্ভবত এ কারণেই অতীতকে বিচার করার আগে তাকে বোঝা জরুরি। কারণ, যে সাহিত্যকে আমরা আজ প্রশ্ন করি, সেই সাহিত্যই হয়তো আমাদের প্রশ্ন করার ভাষাটিও তৈরি করে দিয়েছে।
আপনার কী মনে হয়?
তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের কোন সীমাবদ্ধতাগুলো আজও আমাদের সাহিত্যে রয়ে গেছে?
যুক্তি দিয়ে বলুন। আলোচনা হোক।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।