ঘর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
জীবন নিয়ে ভাবনা। ২২ অক্টোবর ২০২৬
দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম। ড্রয়িংরুমে টেলিভিশন চলছে। মা খাবার টেবিলে ভাত বেড়ে রেখেছে। বাবা সোফায় বসে আছেন। পাশের ঘর থেকে কথার শব্দ আসছে।
সবাই আছে। শুধু আমার জন্য কোনো কথা নেই।
কেউ জিজ্ঞেস করল না, এত দেরি হলো কেন। কেউ বলল না, খেয়েছিস? আমিও কিছু বললাম না। জুতো খুলে নিজের ঘরে চলে গেলাম। জামাকাপড় বদলে আবার বেরিয়ে এলাম খেতে।
টেবিলে ভাত, ডাল, মাছের তরকারি। মা আমার প্লেটের পাশে মাছের একটা টুকরো রেখে দিল। ছোটবেলায় যেটা আমার পছন্দের ছিল। এখনো পছন্দ করি কি না, কেউ জিজ্ঞেস করেনি। আমিও বলিনি।
খেতে বসে মনে হলো, এই মানুষগুলোর সঙ্গে কত কথা বলার ছিল আমার। অথচ একটা কথাও শুরু করতে পারছি না।
কয়েক দিন ধরে বাড়িতে অশান্তি চলছে। কে ঠিক, কে ভুল, সেই হিসাব করতে করতে কখন যে কথাগুলো সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, কেউ খেয়াল করেনি। এখন সামান্য একটা প্রশ্ন থেকেও নতুন ঝগড়া শুরু হতে পারে। তাই সবাই কথা বলার আগে ভাবে। তারপর কথা না বলাই নিরাপদ মনে করে।
আমি চুপ করে ভাত মাখতে থাকি।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, উঠে গিয়ে বলি, এভাবে আর কত দিন চলবে? আমরা কি কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারব? এত দিনের সম্পর্ক কি কয়েকটা রাগের কথার চেয়ে ছোট হয়ে গেল?
কিন্তু কথাগুলো মুখ পর্যন্ত এসে থেমে যায়। কারণ আমি জানি, কথাটা যেভাবে বলতে চাই, সেভাবে হয়তো শোনা হবে না। আমার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে পুরোনো অভিযোগ উঠে আসবে। কে আগে কী বলেছিল, কে কাকে কতটা অসম্মান করেছে, সেই হিসাব শুরু হবে আবার।
শেষ পর্যন্ত চুপ করে থাকি।
আমার এই চুপ করে থাকাকে কেউ হয়তো অহংকার ভাবে। কেউ ভাবে, আমার কিছু যায় আসে না। অথচ ভেতরে ভেতরে কতবার যে ভেবেছি, সব ছেড়ে কোথাও চলে যাই! এমন একটা জায়গায়, যেখানে কারও মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে হবে না আজ কথা বলা নিরাপদ কি না। যেখানে ঘরে ফেরার আগে বুকের ভেতর অকারণ একটা চাপ অনুভব করতে হবে না।
কিন্তু কোথায় যাব?
এই বাড়ির প্রতিটি ঘরে আমার কত স্মৃতি। এই টেবিলে বসেই একসময় সবাই মিলে খেয়েছি। সামান্য একটা ঘটনা নিয়ে হাসতে হাসতে খাবার ঠান্ডা হয়ে গেছে। কেউ অসুস্থ হলে অন্যরা রাত জেগেছে। একসময় এই বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করত। বাইরে যত ক্লান্তিই থাকুক, দরজার ওপাশে নিজের মানুষগুলো আছে, এই ভাবনাটুকুই যথেষ্ট ছিল।
সেই মানুষগুলো এখনো আছে। বদলে গেছে শুধু আমাদের মাঝখানের জায়গাটা।
কখনো মনে হয়, তাদেরও হয়তো কষ্ট আছে। হয়তো তারাও আমার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করেছিল, যা আমি বুঝতে পারিনি। হয়তো প্রত্যেকেই নিজের অভিমান নিয়ে বসে আছে, কেউ আগে এগিয়ে আসতে পারছে না। আমি শুধু নিজের দিকটা দেখতে পাচ্ছি। অন্যদের ভেতরে কী চলছে, তা জানি না।
তবু একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। আপনজনের কাছেই যদি নিজের কষ্টের কথা বলা না যায়, তাহলে সেই কষ্ট নিয়ে যাব কোথায়?
রাতে নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করি। বাইরে টেলিভিশনের শব্দ থেমে গেছে। বাড়িটা নিস্তব্ধ। ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকি। কাউকে ফোন করতে ইচ্ছে করে না। এমন কাউকে কীভাবে বোঝাব, যে বাড়িতে আমার সব আপনজন আছে, অথচ সেই বাড়িতেই নিজেকে এত একা লাগে?
হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ে। খাবার টেবিলে মাছের টুকরোটা আমার প্লেটে তুলে দিয়েছিল। কোনো কথা বলেনি। আমিও কিছু বলিনি।
ওই ছোট্ট কাজটার মধ্যে যত্ন ছিল, নাকি অভ্যাস, জানি না। হয়তো মা-ও কিছু বলতে চেয়েছিল। হয়তো সেও ভেবেছে, এখন কথা বললে আবার কিছু একটা হয়ে যাবে।
এই ভাবনাটা আমাকে আরও চুপ করিয়ে দেয়।
সব সম্পর্ক একদিনে নষ্ট হয় না। কখনো কখনো প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিমান, না বলা কথা আর ভুল বোঝাবুঝি জমতে জমতে এমন একটা দেয়াল তৈরি করে, যার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকেও আর ঠিকমতো দেখা যায় না।
তবু আমি চাই না, একদিন এই বাড়ির কেউ সত্যিই চলে যাক। চাই না, কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি, যে মানুষটার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল, তার সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ নেই।
হয়তো কাল সকালে নাশতার টেবিলে বসে আমি নিজেই কথা শুরু করব। হয়তো পারব না। হয়তো আবারও সবাই নিজের মতো করে দিন শুরু করবে।
জানি না, আমাদের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো কোনো দিন বলা হবে কি না।
শুধু রাতে দরজা বন্ধ করার আগে একবার বাইরে তাকাই। মা পাশের ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিচ্ছে। বাবা নিজের ঘরে চলে গেছেন।
একই বাড়িতে সবাই ঘুমাতে যাবে। অথচ কারও সঙ্গে কারও মনের কথাটা বলা হলো না।
দরজাটা বন্ধ করে দিই।
ঘরটা আমার। কিন্তু এই ঘরে শান্তিতে শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকু যেন আজকাল নিজের কাছেই চাইতে হয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।