কিশোরীদের দ্বৈত পরিচয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
একটা কিশোরী মেয়ের দিন শুরু হয় দুই রকম মুখ নিয়ে। একটা মুখ বাড়ির জন্য, আরেকটা বাইরের দুনিয়ার জন্য।
বাড়িতে সে শান্ত, সংযত, প্রশ্ন না করা মেয়ে। কী পরবে, কার সাথে কথা বলবে, কতক্ষণ ফোনে থাকবে—সবকিছুর জন্য হিসাব দিতে হয়।
আর বাইরে?
স্কুলে, কলেজে, সোশ্যাল মিডিয়ায়—সে আলাদা। সেখানে সে নিজের মতো হতে চায়, কথা বলতে চায়, ছবি দিতে চায়, হাসতে চায়।
এই দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে ধীরে ধীরে শিখে যায়—সব কথা বলা যায় না।
সব অনুভূতি দেখানো নিরাপদ নয়।
এভাবেই শুরু হয় দ্বৈত জীবন। বাড়ির মেয়ে বনাম বাইরের মেয়ে। বেশিরভাগ পরিবারেই কিশোরীদের জন্য কিছু অলিখিত নিয়ম থাকে।
“মেয়েদের এসব মানায় না।”
“এত কথা বলিস কেন?”
“ফোনটা নামা, কে জানে কী করছে!”
এই কথাগুলো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না হলেও একটা ভয় তৈরি করে। মেয়েটা বুঝে যায়—সবটা শেয়ার করলে সমস্যা হবে।
ফলে সে ধীরে ধীরে নিজের একটা অংশ বাড়ির ভেতর লুকিয়ে রাখতে শেখে।
বন্ধুদের কথা, ভালো লাগা, প্রেম, রাগ, প্রশ্ন—সব আলাদা করে রাখে।
বাইরের জগতে সে হাসে, পোস্ট দেয়, মেসেজ করে। বাড়িতে ফিরে এসে সে চুপ। এই চুপ থাকা কিন্তু শান্তি নয়। এটা আত্মরক্ষা।
সোশ্যাল মিডিয়া কিশোরীদের জন্য একধরনের মুক্তির জায়গা। এখানে কেউ সরাসরি প্রশ্ন করে না, চোখে চোখ রেখে বিচার করে না।
এখানে তারা নিজের নাম বদলাতে পারে, ছবি বেছে নিতে পারে, নিজের গল্প নিজের মতো সাজাতে পারে।
কিন্তু এই স্বাধীনতারও একটা মূল্য আছে।
একাধিক অ্যাকাউন্ট, আলাদা আলাদা পরিচয়, কার কাছে কোন কথা বলা যাবে তার হিসাব—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ বাড়ে।
একটা মেয়ে জানে, বাড়িতে যদি এই পোস্টটা দেখা যায়, সমস্যা হবে। তাই সে লুকায়, মিথ্যা বলে, অর্ধসত্য বলে।
মিথ্যা এখানে খারাপ অভ্যাস হিসেবে আসে না।
এটা আসে বাঁচার কৌশল হিসেবে।
যখন একজন মানুষ প্রতিদিন দুই রকমভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে, তখন একসময় সে নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে—আমি আসলে কে?
আমি কি সেই মেয়ে, যে বাড়িতে চুপচাপ থাকে?
নাকি সেই মেয়ে, যে বাইরে হাসে, কথা বলে, স্বপ্ন দেখে?
এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে পরিচয় সংকট তৈরি হয়।
নিজের ওপর বিশ্বাস কমে যায়। আত্মসম্মান নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
অনেক কিশোরী তখন মনে করে, “আমার আসল আমি কাউকে দেখানো যায় না।”
এই ভাবনা দীর্ঘদিন থাকলে উদ্বেগ, একাকিত্ব, এমনকি বিষণ্নতাও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এই দ্বৈত জীবন কাউকে বলা যায় না। বাড়িতে বললে বোঝে না।
বন্ধুদের বললে সব বোঝে না। শিক্ষকরাও অনেক সময় বিষয়টা এড়িয়ে যান।
ফলে কিশোরীরা নিজের ভেতরেই সব চাপ জমায়।
চাপ জমতে জমতে একসময় ছোট বিষয়েও অতিরিক্ত রিঅ্যাকশন আসে। রাগ, কান্না, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া—এসব লক্ষণ দেখা যায়।
বাইরে থেকে মনে হয়, “ও তো ঠিকই আছে।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধান কিশোরীদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে বড়দের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সব কথা শুনতে না পারলেও অন্তত শোনার ভান না করে সত্যি শুনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রণ আর যত্নের পার্থক্য বুঝতে হবে।
নিয়ন্ত্রণ মানে প্রশ্নহীন বাধা।
যত্ন মানে আলোচনা, যুক্তি আর সম্মান।
তৃতীয়ত, ভুল করলে শাস্তির ভয় না দেখিয়ে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে।
ভুল লুকাতে শেখালে মিথ্যাই বাড়বে।
আর কিশোরীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি—একজন নিরাপদ মানুষ।
যার কাছে সে বিচার ছাড়া নিজের কথা বলতে পারে।
কিশোরীদের দ্বৈত পরিচয় কোনো ফ্যাশন নয়। এটা আমাদের সমাজের চাপের ফল।
যেদিন একটি মেয়ে বাড়িতে এবং বাইরে একই মানুষ হতে পারবে, যেদিন তাকে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হবে না, সেদিন এই দ্বৈত জীবনের দরকার পড়বে না।
পরিচয় সংকট কমবে তখনই, যখন আমরা প্রশ্ন কম করে, শোনা বাড়াবো।
কারণ সত্যি কথা হলো—কেউ মিথ্যা বলতে ভালোবাসে না। মানুষ মিথ্যা বলে তখনই, যখন সত্য বলা নিরাপদ থাকে না।
#কিশোরীদেরদ্বৈতপরিচয় #কিশোরীপরিচয়সংকট #মানসিকস্বাস্থ্যকিশোরী
#অনলাইনওবাস্তবজীবন #পরিচয়সংকট #গোপনীয়তারচাপ #কিশোরীমিথ্যাবলন
#পরিবারমানসিকস্বাস্থ্য #প্যারেন্টিং #বাংলাব্লগ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।