অসুখের পর মানুষটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষ অসুস্থ হলে শুধু শরীরটা পরীক্ষা হয় না, তার সম্পর্কগুলোও পরীক্ষা হয়ে যায়।
সুস্থ থাকতে আমরা নিজের কাজ নিজেই করি। সকালে উঠে অফিসে যাই, বাজার করি, ব্যাংকের কাজ সেরে আসি, নিজের ওষুধ কিনি। পরিবারের কে কী চায়, সেটাও দেখি। অন্যের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে কখন যে নিজের জীবনটা অন্যদের ঘিরে চলে যায়, টেরও পাই না।
মনে হয়, এভাবেই তো চলবে।
তারপর একদিন শরীর থেমে যায়।
কয়েকটি পরীক্ষা, ডাক্তার, একগাদা ওষুধ। তারপর হয়তো হাসপাতালের বিছানা। যে মানুষটি এতদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকেই একসময় কারও হাত ধরে হাঁটতে হয়। বিছানা থেকে উঠতেও কাউকে ডাকতে হয়। কোন ওষুধ কখন খেতে হবে, সেটাও অন্য কেউ মনে করিয়ে দেয়।
শরীরের এই পরিবর্তনটা সবাই দেখতে পায়। মনের ভেতরে যে পরিবর্তন শুরু হয়, সেটা দেখা যায় না।
একসময় বাবা সন্তানকে বলতেন, “কী লাগবে বলো।”
বয়স বাড়ার পর সেই বাবাকেই বলতে হয়, “ফেরার সময় আমার ওষুধটা নিয়ে এসো।”
যে মা সারাজীবন সবার খাবার গুছিয়ে দিয়েছেন, একদিন নিজের জন্য এক গ্লাস পানিও অন্যের কাছে চাইতে হয়।
যে মানুষটি সংসারের কঠিন সময়ে সবার সামনে দাঁড়িয়েছেন, তাকেই একসময় হাসপাতালের কাগজ হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করতে হয়, “ডাক্তার কী বললেন?”
এই বদলটা শরীরের চেয়ে মনেই বেশি লাগে।
বিশেষ করে যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের ভরসা হয়ে থেকেছেন, তার কাছে নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্যের দিকে তাকানো সহজ নয়।
তাই অনেক অসুস্থ মানুষ কষ্টটাও ছোট করে বলেন।
ব্যথা হচ্ছে, তবু বলেন, “এখন একটু কম।”
ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু বলেন না।
ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তবু ভাবেন, “আরেক দিন দেখি।”
রাতে শরীর খারাপ লাগে। পাশে থাকা মানুষটাকে ডাকতে গিয়েও থেমে যান। মনে হয়, সারাদিন মানুষটা এত কাজ করেছে, আবার ঘুম থেকে তুলে বিরক্ত করব কেন?
এই সামান্য দ্বিধার ভেতরেই জমে থাকে অনেক না বলা কথা।
আমরা অসুস্থ মানুষের প্রয়োজন বলতে ওষুধ, পরীক্ষা, ডাক্তার আর হাসপাতালের কথাই বুঝি। অথচ তার আরেকটি প্রয়োজন আছে—সে যেন বুঝতে পারে, অসুস্থ হওয়ার পরও সে পরিবারের একজন মানুষ।
শুধু রোগী নয়।
শুধু বাড়তি খরচ নয়।
অসুস্থ মানুষকে দেখাশোনা করতে করতে পরিবারের অন্যরাও ক্লান্ত হয়। চিকিৎসার খরচ, কাজের চাপ, হাসপাতালে ছোটাছুটি, ঘুম কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে বিরক্তি আসতেই পারে।
কিন্তু ক্লান্তি আর অবহেলা এক জিনিস নয়।
ক্লান্তি থেকে মানুষ একটু বিশ্রাম চায়। অবহেলা অসুস্থ মানুষকে নিজের প্রয়োজন নিয়েই অপরাধবোধে ভোগায়।
তখন তার মনে হতে পারে,
“আমার জন্য এত খরচ হচ্ছে।”
“আমাকে নিয়ে সবাইকে এত দৌড়াতে হচ্ছে।”
“আমি না থাকলে হয়তো সবার জীবনটা সহজ হতো।”
কথাগুলো সে হয়তো কাউকে বলবে না। নিজের ভেতরেই রেখে দেবে।
শরীরের ব্যথার কারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে। কিন্তু একজন মানুষ নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করছে কি না, সেটা কোনো রিপোর্টে লেখা থাকে না।
অথচ তার সবসময় বড় কিছু দরকার হয় না।
পাশে কয়েক মিনিট বসে থাকা।
একই কথা বারবার বললেও বিরক্ত না হওয়া।
হাসপাতালে যাওয়ার সময় বলা, “চলো, আমি আছি।”
খাবার সামনে রেখে জিজ্ঞেস করা, “খেতে পারছ?”
সুস্থ অবস্থায় এসব খুব সাধারণ কথা। অসুস্থতার সময় এগুলোর মূল্য অন্যরকম।
অসুস্থ হওয়ার পর আমরা অনেক সময় তার সঙ্গে এমন আচরণ করি, যেন তার শরীরের সঙ্গে তার পরিচয়টাও বদলে গেছে।
আগে সে সংসারের সিদ্ধান্ত নিত। এখন তার মতামত ছাড়াই অনেক সিদ্ধান্ত হয়ে যায়।
আগে নিজের কাজ নিজে করত। এখন তার হয়ে সবকিছু করতে গিয়ে তার কথাটাও অনেকে শুনতে চায় না।
কেউ বলে, “তুমি এসব নিয়ে ভাবো না।”
কথাটা ভালোবেসে বলা হতে পারে। কিন্তু শরীর দুর্বল হয়েছে বলে মানুষের বোধ, অভিজ্ঞতা আর আত্মসম্মান তো দুর্বল হয়ে যায়নি।
সে হয়তো আগের মতো হাঁটতে পারছে না। কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে মত দেওয়ার অধিকার এখনও তার আছে।
তাই যত্ন মানে শুধু তার হয়ে সব কাজ করে দেওয়া নয়। যেখানে সম্ভব, তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটুকুও দেওয়া।
কারণ অসুস্থতা একজন মানুষকে দুর্বল করতে পারে, ছোট করে না।
একজন মানুষ সুস্থ হয়ে উঠবেন কি না, সেটা সবসময় আমাদের হাতে থাকে না। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় তার দিনগুলো কেমন হবে, সেখানে আমাদের আচরণের একটা বড় ভূমিকা থাকে।
হয়তো কয়েক বছর পর সে মনে রাখবে না কোন দিনে কোন পরীক্ষা হয়েছিল। কোন ওষুধ কখন খেয়েছিল, সেটাও ভুলে যেতে পারে।
কিন্তু মনে থাকতে পারে, কঠিন রাতে কে পাশে বসেছিল।
ভয় পেলে কে হাত ধরেছিল।
সাহায্য চাইতে সংকোচ করলে কে বলেছিল, “বলতে লজ্জা পেয়ো না, আমি তো আছি।”
যে মানুষটি একদিন আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, একদিন হয়তো তার হাত ধরেই আমাদের তাকে হাঁটাতে হবে।
সেদিন তার শরীর আমাদের ওপর নির্ভর করবে।
কিন্তু মানুষটা যেন আমাদের চোখে ছোট হয়ে না যায়।
শেষ পর্যন্ত হয়তো তার মনে একটাই প্রশ্ন থাকে—
“আমি কি এখনও আমার আপন মানুষগুলোর কাছে আগের মতোই আপন?”
এই প্রশ্নের উত্তর মুখে দেওয়ার দরকার হয় না।
কখনো একটা চেয়ার টেনে পাশে বসে পড়াই যথেষ্ট।
কখনো ওষুধটা এনে দেওয়াই যথেষ্ট।
কখনো শুধু হাতটা ধরে বললেই হয়,
“আমি আছি।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।