নিজেকে সামলানোর শিল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ০৪, জুন ২০২৬
আমরা প্রায়ই বলি, “সময়টা ভালো যাচ্ছে না।”
চারদিকে চাপ। অস্থিরতা। অজানা ভয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা থেমে এটা ভাবি না—আসলে কোন জিনিসটা আমাদের ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
সমস্যা হলো, আমরা বাইরের পরিস্থিতিকে দোষ দিতে দিতে নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খলাকে অচেনা করে ফেলি। ফলে ধীরে ধীরে আমাদের সহ্যক্ষমতা ছোট হয়ে আসে। সামান্য চাপেও তখন ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
অথচ জীবন কখনো পুরোপুরি অনুকূলে থাকবে না। হঠাৎ প্রতিকূল পরিস্থিতি আসবেই। সম্পর্ক ভাঙবে, পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে, কাছের মানুষ বদলে যাবে। কিন্তু সবকিছুর পরও নিজেকে স্থির রাখতে পারা—এটাই আসল শক্তি।
তাই বাস্তবতা থেকে পালিয়ে না গিয়ে, তার সামনে দাঁড়ানো শিখতে হয়।
সব কষ্ট একা বয়ে নেওয়া পরিণত হওয়ার লক্ষণ না। কখনো কখনো বিশ্বস্ত একজন মানুষের কাছে নিজের অস্থিরতার কথা বলে ফেলাও সাহসের কাজ। হয়তো সে সমাধান দিতে পারবে না, তবু বুকের ভেতরের চাপটা কিছুটা হালকা হবে। মানুষ আসলে সবসময় উপদেশ চায় না, অনেক সময় শুধু শোনা হওয়ার অনুভূতিটুকুই চায়।
আর মনটা একটু হালকা হলে বুঝতে পারবেন—অন্ধকারের মাঝেও মানুষ নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে পারে। ইতিবাচক থাকার মানে এই না যে দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, ভয় নেই। বরং এর মানে হলো—খারাপ সময়ের মধ্যেও নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে না ফেলা। অন্ধকারকে অস্বীকার করা না, বরং বিশ্বাস রাখা যে অন্ধকার স্থায়ী না।
এই কারণেই নিজেকে ব্যস্ত রাখাটা জরুরি। অলস মন খুব দ্রুত নেতিবাচক চিন্তার বাসা হয়ে যায়। নতুন কিছু শিখুন। বই পড়ুন। কাজ করুন। টিউশনি করান। ছোট কোনো দক্ষতা আয়ত্ত করুন। ব্যস্ততা সব সমস্যার সমাধান না, কিন্তু অনেক অপ্রয়োজনীয় কষ্ট থেকে মানুষকে দূরে রাখে।
একটা ব্যর্থতা মানে আপনি ব্যর্থ মানুষ না। জীবনে ভুল হবে, হেরে যাওয়া আসবে। কিন্তু প্রতিটা ব্যর্থতার পর যদি আপনি নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করেন, তাহলে ক্ষতিটা বাইরের না, ভেতরের হয়ে যায়। শেখার জায়গাটা তখন বন্ধ হয়ে যায়।
জীবনে যা নেই, মানুষ সাধারণত সেটাই বেশি দেখে। অথচ যা আছে, তার মূল্য অনেক সময় পরে বুঝতে পারে। সুস্থ শরীর, নিরাপদ ঘর, দু-একজন আপন মানুষ, নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ—এসবও আশীর্বাদ। ছোট ছোট আনন্দকে অবহেলা করতে করতে মানুষ একসময় বড় সুখের অনুভূতিটাও হারিয়ে ফেলে।
সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়। কোথায় “না” বলতে হবে, সেটা শেখা দরকার। বিনয়ী হওয়া ভালো, কিন্তু নিজের ইচ্ছা, সীমা আর সম্মান বিসর্জন দিয়ে না।
আর একটা বিষয়—পরচর্চা থেকে দূরে থাকুন।
অন্যের জীবন নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত মানুষ নিজের জীবনটাই সবচেয়ে কম গুছাতে পারে। কার ব্যর্থতা, কার ভুল, কে কী করল—এসব নিয়ে পড়ে থাকলে নিজের ভেতরের উন্নতিটা থেমে যায়। বড় মনের মানুষ হওয়ার শুরুটা হয় অন্যকে ছোট করে দেখা বন্ধ করার মধ্য দিয়ে।
দিনশেষে সুখ কোনো জাদুকরী ঘটনা না। এটা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে—নিজেকে বুঝতে শেখার মধ্যে, অপ্রয়োজনীয় অশান্তি থেকে দূরে থাকার মধ্যে, আর ভেতরটাকে একটু শান্ত রাখার চেষ্টার মধ্যে।
হয়তো তখন একদিন হঠাৎ বুঝবেন—জীবন নিখুঁত না। তবুও বেঁচে থাকার মধ্যে একটা গোপন শান্তি আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।