সামাজিক মাধ্যমে সুখের ভ্রম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ৮,২০২৬
রাত আটটা।
ডাইনিং টেবিলে ভাতের ধোঁয়া এখনও উঠছে। ঝুলন্ত বাতির হলুদ আলোয় খাবারগুলো বেশ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। কিন্তু টেবিলের চারপাশে বসে থাকা চারজন মানুষের মধ্যে কথাবার্তা খুব কম।
বাবা ফোনে স্ক্রল করছেন। চশমার কাঁচে স্ক্রিনের নীল আলো ঝিলিক দিচ্ছে।
মা ফেসবুকে কারও ছবিতে একটি হৃদয়ের চিহ্ন দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানালেন।
ছেলে হেডফোন কানে ইউটিউবের ভিডিওতে ডুবে আছে।
মেয়ে ইনস্টাগ্রামে নতুন একটি স্টোরি আপলোড করছে।
একই টেবিল।
তবু চারটি আলাদা জগৎ।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো—এর কিছুক্ষণ আগেই এই পরিবার সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেছে। সেখানে সবাই হাসিমুখে বসে আছে, যেন নিখুঁত এক পারিবারিক মুহূর্ত।
ক্যাপশন—
“Family time.”
লাইক বাড়ছে। কমেন্ট আসছে—
“কি সুন্দর পরিবার!”
“মাশাআল্লাহ!”
“সবসময় এমন থাকুন।”
ছবিটি নিখুঁত।
কিন্তু ছবির বাইরের গল্পটি কেউ দেখে না।
সামাজিক মাধ্যম আমাদের জীবনে এক ধরনের নতুন মঞ্চ তৈরি করেছে। এখানে মানুষ তার পুরো জীবন দেখায় না; বরং জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল কয়েকটি মুহূর্ত বেছে নেয়।
একসময় পারিবারিক ছবি তোলা হতো স্মৃতি ধরে রাখার জন্য। এখন অনেক সময় সেই ছবি হয়ে ওঠে এক ধরনের ঘোষণা—
আমরা সুখী।
আমরা একসঙ্গে।
আমাদের জীবন সুন্দর।
কিন্তু এই ঘোষণাটি আসলে কার জন্য?
বেশিরভাগ সময় অন্যদের জন্যই।
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চায় তাকে ভালোভাবে দেখা হোক। সামাজিক মাধ্যম সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
ফলে অনেক সময় দেখা যায়—আমরা সম্পর্কটাকে যতটা না যত্ন করি, তার চেয়ে বেশি যত্ন করি সম্পর্কের ছবিটাকে।
আজকের পরিবারগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান।
কে কোথায় খেতে গেল।
কার সন্তান কোথায় পড়ে।
কে কোথায় ঘুরতে গেল।
সবকিছুই এখন আমাদের চোখের সামনে।
কিন্তু এই দৃশ্যমানতার আড়ালে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের নিঃশব্দ বিচ্ছিন্নতা।
একসময় পরিবারের ভেতরে দীর্ঘ আলাপ ছিল খুব স্বাভাবিক বিষয়। দিনের শেষে সবাই বসে গল্প করত—কখনো হাসি, কখনো তর্ক, আবার মিল।
এখন অনেক সময় “কেমন আছো?” প্রশ্নটি থেমে যায় একটি ছোট প্রতীকে।
কখনো একটি হাসি।
কখনো একটি হৃদয়।
কখনো শুধু দ্রুত একটি সম্মতি।
এই ছোট প্রতীকগুলো ধীরে ধীরে অনেক কথার জায়গা দখল করে নিচ্ছে।
প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন প্রযুক্তি মানুষের জায়গা নিতে শুরু করে।
আজকের অনেক পরিবারে সবচেয়ে ব্যস্ত সদস্যটি মানুষ নয়—একটি ছোট স্ক্রিন।
একটি সম্পর্ক টিকে থাকে তিনটি জিনিসের ওপর—সময়, মনোযোগ এবং বোঝাপড়া।
কিন্তু স্ক্রিন প্রায়ই এই তিনটিকেই ভেঙে দেয়।
এক সন্ধ্যায় এক পরিচিত মানুষ একটি ছোট ঘটনা বলছিলেন।
তিনি সোফায় বসে ফোনে ব্যস্ত ছিলেন। পাশের ঘরে তার ছেলে খেলছিল। কিছুক্ষণ পরে ছেলেটি এসে সামনে দাঁড়াল।
“বাবা?”
তিনি ফোন থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “হ্যাঁ?”
ছেলেটি একটু থেমে বলল—
“তুমি কি একটু আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারো?”
বাক্যটি খুব ছোট।
কিন্তু এর ভেতরে আজকের অনেক পরিবারের গল্প লুকিয়ে আছে।
আমরা আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত।
তবু অনেক সময় কম একসঙ্গে।
সামাজিক মাধ্যম আমাদের জীবনে আরেকটি সূক্ষ্ম চাপ তৈরি করেছে—সুখ দেখানোর চাপ।
অন্যদের হাসিমুখের ছবি দেখতে দেখতে আমরা অজান্তেই নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা শুরু করি।
তারপর ধীরে ধীরে আমরাও আমাদের সুখের মুহূর্তগুলো তুলে ধরতে চাই।
এভাবেই তৈরি হয় এক ধরনের ডিজিটাল মঞ্চ, যেখানে সুখের দৃশ্যগুলোই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এখানে কেউ ক্লান্তি দেখায় না।
কেউ দুঃখ দেখায় না।
কেউ সম্পর্কের ভেতরের অস্বস্তিকর মুহূর্তগুলো দেখায় না।
ফলে তাকালে মনে হয়—পৃথিবীতে যেন আর কোনো অসম্পূর্ণ পরিবার নেই।
বাস্তবে কিন্তু গল্পটা প্রায়ই ভিন্ন।
অনেক পরিবারের ছবিগুলো উজ্জ্বল।
কিন্তু কথোপকথন ফিকে।
পরিবারের ভেতরের বিচ্ছিন্নতা হঠাৎ তৈরি হয় না।
এটি ধীরে ধীরে জমে।
আজ কথা হয়নি।
কালও হয়নি।
পরশুও হয়নি।
একসময় আমরা বুঝতে পারি—একই ঘরে থেকেও মানুষগুলো যেন একটু দূরে সরে গেছে।
ডাইনিং টেবিল তখন শুধু খাওয়ার জায়গা হয়ে থাকে।
কথার জায়গা নয়।
তবু সম্পর্কের আশা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না অনেক সময়।
হয়তো শুধু এতটুকুই—
ডাইনিং টেবিলে ফোন না আনা।
সমাধান দেওয়ার আগে মানুষের কথাটা শেষ পর্যন্ত শোনা।
কিছু সময় শুধু উপস্থিত থাকা।
কারণ মানুষ আসলে খুব জটিল কিছু চায় না।
সে শুধু চায়—
কেউ তাকে মন দিয়ে শুনুক।
রাত আটটা।
ডাইনিং টেবিলে আবার চারজন মানুষ বসে আছে।
ফোনগুলো এবার টেবিলের এক পাশে রাখা—পুরোপুরি নয়, অন্তত কিছুক্ষণের জন্য।
কথা খুব বড় কিছু নয়—
স্কুলের গল্প, অফিসের ঝামেলা, বাজারের দাম।
তবু ঘরটা আগের চেয়ে একটু উষ্ণ।
একই টেবিলে বসে থাকা মানুষগুলো
কিছু সময়ের জন্য
একে অপরের দিকে তাকায়—
এবং সত্যি করে শোনে।
হয়তো এই মুহূর্তটির কোনো ছবি তোলা হবে না।
তবু অনেক সময় ক্যামেরার বাইরে থাকা মুহূর্তগুলোই
সবচেয়ে সত্য।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।