বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৩০ জুন, ২০২৬
"বাবা-মা বুড়ো হওয়ার আগে আমরা ব্যস্ত হয়ে যাই, আর ব্যস্ততা একটু কমতে কমতে দেখি, তারা অনেকটাই একা হয়ে গেছেন।"
কয়েক দিন আগে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। রাতের খাওয়া শেষ। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ ফোনে, কেউ টেলিভিশনের সামনে।
ওর বাবা একা বারান্দায় বসে ছিলেন।
হঠাৎ হেসে বললেন,
"তোদের ছোটবেলায় খেতে বসলে কত গল্প হতো। এখন সবাই একসঙ্গে বসে, কিন্তু কারও সঙ্গে যেন কারও দেখা হয় না।"
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরও মাথা থেকে নামেনি।
আমার মনে হয়, বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব কোনো বড় ঝগড়া দিয়ে শুরু হয় না।
শুরু হয় খুব ছোট ছোট জায়গা থেকে।
আজ একটা ফোন ধরা হলো না।
কাল বললাম, "এখন একটু ব্যস্ত, পরে কথা বলি।" তারপর সেই "পরে" আর এল না।
এভাবেই দূরত্ব তৈরি হয়।
ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে আমরা সব গল্প বাবা-মাকে বলতাম। ক্লাসে কী হলো, কার সঙ্গে ঝগড়া হলো, পরীক্ষায় কত পেলাম—সব। তারা শুনতেন। কখনও ক্লান্ত থাকলেও শুনতেন।
আজ আমরা বড় হয়েছি। দায়িত্ব বেড়েছে। ব্যস্ততাও বেড়েছে। ব্যস্ত হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু একটা সময় সেই ব্যস্ততার তালিকায় বাবা-মায়ের নামটা অজান্তেই নিচে নেমে যায়।
আমরা ভাবি, মাসে টাকা পাঠাচ্ছি, ওষুধ কিনে দিচ্ছি, দরকার হলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি—দায়িত্ব তো পালনই করছি।
কিন্তু একটা বয়সের পর বাবা-মা টাকার চেয়ে বেশি খোঁজেন মানুষকে।
তারা হয়তো শুধু জিজ্ঞেস করতে চান,
"আজ সারাদিন কেমন কাটল?"
অথবা বলতে চান,
"আজ তোর ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ছিল।"
এই কথাগুলো শোনার মতো মানুষটাই যদি পাশে না থাকে, তাহলে বাড়ি ভরা মানুষ থাকলেও একাকীত্ব থেকে যায়।
আমার মনে হয়,
বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু রাগ নয়, অবহেলা।
রাগ হলে মানুষ তর্ক করে। অভিমান হলেও একদিন না একদিন প্রকাশ পায়।
কিন্তু অবহেলা কোনো শব্দ করে না।
একজন অপেক্ষা করেন,
আরেকজন ভাবেন, "আগামীকাল সময় দেব।" তারপর সেই আগামীকাল কবে যেন হারিয়ে যায়।
আজকাল একটা দৃশ্য খুব পরিচিত।
রাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। সামনে ভাতের প্লেট। কথাবার্তা হচ্ছে শুধু, "ডালটা দাও", "পানিটা দাও।"
বাকি সময় সবার চোখ ফোনের স্ক্রিনে।
একই টেবিলে বসে থেকেও কেউ জানে না, আজ বাবা সারাদিন কী ভাবলেন। মা কেন এত চুপচাপ।
এভাবেই সম্পর্ক ভাঙে না,
কিন্তু আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে যায়।
তাহলে কী করা যায়?
হয়তো খুব বড় কিছু না।
আজ রাতে ভাতের প্লেটটা সরানোর আগে ফোনটা সরিয়ে রাখুন। তারপর শুধু জিজ্ঞেস করুন,
"মা, আজ শরীরটা কেমন?"
অথবা,
"বাবা, আজ দিনটা কেমন গেল?"
হয়তো উত্তর খুব সাধারণ হবে। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের কথোপকথন তাদের পুরো দিনটাকে বদলে দিতে পারে।
আর একটা কথা আমরা প্রায়ই বুঝতে পারি না।
বাবা-মা অনেক সময় নিজের কষ্টটা মুখে বলেন না। তারা ভাবেন, "ছেলেমেয়েটা এত ব্যস্ত, আর বিরক্ত করব না।"
আমরা সেই নীরবতাকে স্বাভাবিক ভেবে নিই।
অথচ ওই চুপ করে থাকার মধ্যেই অনেক অভিমান জমে থাকে।
অবশ্যই সব পরিবারের গল্প এক রকম নয়। কোথাও পুরোনো কষ্ট আছে, কোথাও সম্পর্কের জটিলতা।
তাই সব সমস্যার সমাধানও এক হবে না।
তবু যেখানে ভালোবাসা এখনও বেঁচে আছে, সেখানে সময় আর কথোপকথন অনেক দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে।
হয়তো সম্পর্ক ঠিক করার জন্য কোনো বড় সিদ্ধান্তের দরকার নেই।
দরকার শুধু আজ রাতে পাঁচ মিনিট আগে উঠে গিয়ে বলা,
"মা, বাবা... ফোনটা পরে দেখি। আগে তোমাদের সঙ্গে একটু গল্প করি।"
হয়তো এই একটি বাক্যই এমন একটা কথোপকথনের শুরু হবে, যার অপেক্ষায় তারা অনেক দিন ধরে আছেন।
আপনার মতে, বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।