দ্বিতীয় দরজা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দ্বিতীয় বিয়ের খবর শুনে প্রথমে অবাক হইনি। অবাক হয়েছিলাম মেয়েটার কথাটা শুনে।
বাবা আবার বিয়ে করবেন জেনে মেয়েটা নাকি শুধু বলেছিল, “আব্বু, তুমি কি আমাদের বাসায় আর থাকবে?”
কথাটা খুব ছোট। কিন্তু তার ভেতরে একটা শিশুর ভয়, অভিমান আর অনিশ্চয়তা একসঙ্গে লুকিয়ে আছে।
একজন পুরুষ দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না।
কারও স্ত্রী মারা গেছেন। দীর্ঘদিন একা থাকার পর একটা সময় ঘরটা অসহ্য নীরব লাগে। সকালে নাশতা করার সময় কথা বলার কেউ নেই। চায়ের কাপটা একাই ধোয়া হয়। অসুস্থ হলে নিজেই ওষুধ খুঁজতে হয়। ঈদের দিন নতুন জামা কিনে দেওয়ার মানুষ থাকে, কিন্তু পাশে বসে “কেমন লাগছে?” বলার মানুষ থাকে না। এই একাকিত্ব বাইরে থেকে খুব সহজে বোঝা যায় না।
আবার কারও প্রথম সংসারটা বেঁচে থেকেও শেষ হয়ে যায়। একই ছাদের নিচে দুজন মানুষ থাকে, অথচ কথা থাকে না। রাত বাড়লে ঝগড়া, সকালে মুখ ফিরিয়ে থাকা, খাবার টেবিলে নীরবতা। দিনের পর দিন এমন একটা সম্পর্ক টেনে নেওয়ার পর কেউ কেউ মনে করেন, আর নয়।
সেখানেই দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্নটা আসে।
কিন্তু পুরুষটি একা থাকেন না। তাঁর সঙ্গে থাকে আগের সংসারের সন্তানও। এখানেই হিসাবটা কঠিন হয়ে যায়।
একজন বাবা ভাবেন, সন্তানদের জন্য একজন মানুষ দরকার। স্কুল থেকে ফিরে কেউ জিজ্ঞেস করবে, “খেয়েছিস?” জ্বর হলে মাথায় পানি দেবে।
ভাবনাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে নারী নতুন করে সেই ঘরে আসছেন, তিনিও তো একজন মানুষ। তাঁকে যদি প্রথম দিন থেকেই শুধু বলা হয়, “আমার সন্তানদের দেখবে”, তাহলে তিনি স্ত্রী হয়ে ঘরে ঢুকলেন, নাকি একজন দায়িত্ব নেওয়ার মানুষ হয়ে ঢুকলেন?
হয়তো তাঁরও মনে প্রশ্ন থাকে, “আমার জন্য এই ঘরে জায়গাটা কোথায়?” এই প্রশ্নটা খুব কম মানুষ করেন।
নতুন মানুষটি পুরোনো সংসারে ঢোকেন। সেখানে পুরোনো ছবি আছে, পুরোনো স্মৃতি আছে, সন্তানদের মায়ের জায়গাটা আছে। আর সন্তানও সবসময় তাঁকে সহজে গ্রহণ করবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। একটা শিশু হয়তো মনে মনে ভাবতে পারে, নতুন মানুষটা তার মাকে সরিয়ে দিয়েছে। অথচ সেই নারী হয়তো কাউকে সরাতে আসেননি।
এই ভুল বোঝাবুঝিটাই অনেক সংসারকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়।
আর একটা সত্যও আছে।
বউ বদলানো যায়। স্বভাবটা সঙ্গে থাকে।
তাই দ্বিতীয় বিয়ে অনেক সময় নতুন জীবন শুরু করার চেয়ে পুরোনো মানুষটাকেই নতুন ঘরে নিয়ে যাওয়ার গল্প হয়ে দাঁড়ায়।
তবু দ্বিতীয় বিয়ে মানেই ভুল নয়। একজন বিপত্নীক মানুষের আবার সংসার করার অধিকার আছে। নতুন করে ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার কারও কাছ থেকেই কেড়ে নেওয়া যায় না।
শুধু দরজাটা খোলার আগে ভেতরে যারা আছে, তাদের কথাও শুনতে হয়। সন্তানকে। নতুন স্ত্রীকে। আর নিজের মনকেও।
কারণ নতুন ঘরে আলো জ্বালানো খুব কঠিন নয়। কঠিন হলো, সেই আলোয় পুরোনো মুখগুলোও যেন একেবারে অচেনা না হয়ে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।