সম্পত্তির হিসাবে আপনজন
(উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পর্ক)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২২ অক্টোবর ২০২৬
বাবার ঘরে জমির কাগজপত্র নিয়ে বসেছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই বললেন, “বাবার শেষ বয়সে আমিই তো সব দেখেছি। সম্পত্তির ভাগ করার সময় সেটা বিবেচনা করতে হবে না?”
ছোট ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমি বাবার পাশে ছিলে, সেটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু তাই বলে আমার প্রাপ্যটুকু কি তোমার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে?”
পাশের ঘরে বসে বাবা কথাগুলো শুনছিলেন। যে দুই ছেলেকে তিনি একসঙ্গে বড় করেছেন, আজ তাদের কথায় সম্পত্তির হিসাবের পাশাপাশি পুরোনো অভিযোগও উঠে আসছে।
এমন বিরোধে জমির পরিমাণ যতটা আলোচনায় আসে, তার চেয়ে বেশি সামনে আসে কে কতটা করেছে, কে কতটা পেয়েছে, আর বাবা কাকে বেশি আপন ভাবেন। সম্পত্তির কাগজ বের হওয়ার পর অনেক সময় বোঝা যায়, পরিবারের ভেতরে বৈষম্যটা আসলে বহু বছর ধরেই ছিল।
ত্যাগের দাম কতটুকু?
বড় ছেলে হয়তো দীর্ঘদিন বাবার চিকিৎসা করিয়েছেন, ওষুধ কিনেছেন, রাত জেগে পাশে থেকেছেন। অন্য ভাইবোনেরা দূরে থাকায় দায়িত্বের বেশির ভাগ তাঁর ওপরই পড়েছে। তাঁর কষ্ট অস্বীকার করা অন্যায়।
কিন্তু সেই ত্যাগের কথা বলে অন্য ভাইবোনের প্রাপ্য নির্ধারণ করার অধিকার কি তিনি নিজেই নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন?
যিনি পাশে থেকেছেন, তাঁর অবদান স্বীকার করা দরকার। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পরিচর্যার দায়িত্ব আর সম্পত্তির ওপর কর্তৃত্ব এক জিনিস নয়।
অনেক সময় যিনি সবচেয়ে বেশি সেবা করেছেন, তাঁর মনে ক্ষোভ জমে। তিনি ভাবেন, বিপদের সময় অন্যরা ছিল না, এখন সম্পত্তির ভাগ নিতে সবাই হাজির। এই অভিমান অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার সমাধান অন্যের ন্যায্য প্রাপ্য আটকে রাখা হতে পারে না।
যে সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসার পাশাপাশি দায়িত্বের হিসাবও থাকে, সেখানে হিসাব নিয়ে কথা বলা দরকার। তবে সেই হিসাব যেন কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র না হয়।
মেয়ের জন্য কোন বাড়ি?
ছেলেকে বলা হয়, “এই বাড়ি একদিন তোকেই দেখতে হবে।”
মেয়েকে বলা হয়, “তোর তো বিয়ে হয়ে যাবে, অন্য বাড়িতে সংসার করবি।”
কথা দুটি হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা হয়। বাবা-মা সব সময় বৈষম্য করার উদ্দেশ্যে এমন কথা বলেন না। কিন্তু বারবার শুনতে শুনতে মেয়েটি বুঝে যায়, এই বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলের যতটা ভাবার অধিকার আছে, তার ততটা নেই।
বিয়ের পর সে বাবার বাড়িতে আসে, বাবা-মায়ের খোঁজ নেয়, অসুস্থ হলে ছুটে যায়। অথচ নিজের প্রাপ্যের কথা তুলতে গেলে তার গলায় সংকোচ এসে জমে। ভাই কী ভাববে, আত্মীয়রা কী বলবে, বাবা কষ্ট পাবেন কি না—এসব ভাবতে ভাবতেই সে হয়তো নিজের কথাটাই আর বলে না।
আইনে মেয়ের ভাগ কতটুকু, সেটা বইয়ে আছে। কিন্তু বইয়ের বাইরে যে অলিখিত আইন—‘মেয়ে চাইলে সম্পর্ক নষ্ট হবে’—সেই আইনটা কে লিখল?
একজন মেয়ে নিজের প্রাপ্য নিয়ে কথা বললেই সে লোভী হয়ে যায় কেন? ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে হলে নিজের অধিকার নিয়ে নীরব থাকতেই হবে কেন?
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাবা-মায়ের বিপদে এই মেয়েকেই সবার আগে ডাকা হয়। তাঁর অসুস্থতায় পাশে থাকা, সংসারের খোঁজ নেওয়া কিংবা প্রয়োজনে ছুটে আসার সময় তাকে বাইরের মানুষ মনে হয় না। কিন্তু সম্পত্তির কথা উঠলেই হঠাৎ মনে করিয়ে দেওয়া হয়, বিয়ের পর তার তো আলাদা সংসার হয়েছে।
দায়িত্বের সময় সে পরিবারের মেয়ে, আর প্রাপ্যের সময় সে অন্য বাড়ির মানুষ—এই হিসাবের নাম কী?
বাবার নীরবতা
সম্পত্তির বিরোধে সন্তানদের কথা শুনতে শুনতে বাবা-মা অনেক সময় এমন অবস্থায় পড়েন, যেখানে কাউকে সমর্থন করলেই অন্যজনের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেউ ঝগড়া এড়াতে চুপ থাকেন, কেউ সন্তানদের মন রাখতে গিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করেন না।
কিন্তু সেই নীরবতার সুযোগে সন্তানদের কেউ যদি সব সিদ্ধান্ত নিজের হাতে তুলে নেন, তাহলে বাবা-মায়ের সম্পত্তি তাঁদের ইচ্ছার বদলে পরিবারের ক্ষমতাবান সদস্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
বাবা-মায়েরও নিজস্ব মতামত আছে। তাঁদের জীবনের সঞ্চয় নিয়ে আলোচনা করার সময় তাঁদের কথা শোনা কোনো অনুগ্রহ নয়। আর সন্তানদের উচিত নয় তাঁদের ভালোবাসাকে সম্পত্তি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত করা।
কারণ সম্পত্তির ভাগ নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু নিজের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে বাবাকে চাপ দেওয়া, ভাইবোনকে অপমান করা কিংবা কারও প্রাপ্যকে দয়ার বিষয় বানিয়ে ফেলা সম্পর্কের ক্ষতি করে।
যে কথাটা কেউ বলে না
একটি বাড়ির জমি ভাগ করা যায়। কার কতটুকু প্রাপ্য, তার হিসাবও করা যায়। কিন্তু পরিবারের কারও মনে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অবহেলার হিসাব এত সহজে মেটে না।
যে মেয়েটি নিজের প্রাপ্যের কথা বলতে পারেনি, সে হয়তো পরের ঈদেও বাবার বাড়িতে আসবে। বাবার জন্য কিছু নিয়ে আসবে, মায়ের পাশে বসবে, ভাইয়ের সন্তানদের আদর করবে। বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, এই বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কের ভেতরে কতগুলো না-বলা কথা জমে আছে।
ভাই হয়তো ভাববে, বোন তো কখনো কিছু চায়নি। বাবা ভাববেন, সন্তানদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।
অথচ সে চুপ ছিল সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য, নিজের প্রাপ্যকে অস্বীকার করার জন্য নয়।
একদিন সম্পত্তির ভাগ ঠিক হয়ে যাবে। শুধু পরিবারের মানুষগুলো বুঝতে পারবে না, সেই ভাগ করতে গিয়ে কখন যে আপনজনের মন থেকে তাদের জায়গাটুকু হারিয়ে গেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।